খাদ্য ও ফলমূলে বিষ:প্রতিরোধ করতে হবে এখনই

কতিপয় ব্যবসায়ীদের নিকট মুনাফার বিষয়টি সব কিছুকেই হার মানায়। তাদের নিকট ক্রেতা বা ভোক্তার জীবন তুচ্ছ, টাকাই মুখ্য। অথচ প্রতিটি মানুষের নিকট তার জীবনের চেয়ে আপন আর কিছুই নেই। জীবনে সুস্থ থাকাও অনেক বড় নিয়ামত ও সম্পদ। এদেশের হাতেগোনা কিছু সংখ্যক ব্যবসায়ীর হাতে গোটা দেশের মানুষ জিম্মি। টাকা খরচ করে বিষ খাচ্ছি, ছোট-বড়, ধনী-দরিদ্র, এক কথায় সবাই। প্রতিবছর হাজার হাজার শিশু হতে বৃদ্ধ সবাই ডাক্তারের শরনাপন্ন হচ্ছি শুধুমাত্র ভেজাল মিশ্রিত ফলমূল, মাছ, শাক-সবজি ও তৈরী খাবার খেয়ে। বিভিন্ন পরীক্ষা নিরিক্ষান্তে দেখা যায় কিডনী, লিভার পাকস্থলীসহ অনেক অঙ্গই জটিল রোগে আক্রান্ত। পরিসংখ্যানে দেখা যায় ফল-মূল, মাছ, মাংস ও তৈরী খাবার সবকিছুতেই কম বেশী ভেজাল, যা কেমিক্যাল নামের বিভিন্ন বিষাক্ত পদার্থ।

যেমন ফল পাকাতে ক্যালসিয়াম কার্বাইড (বিষ), মাছ, মাংস, দুধে ফরমালিন (যা মৃত মানুষসহ সংরক্ষণে ব্যবহার হয়ে থাকে) সালফিউরিক এসিড গুড়াদুধে, ডিডিটি পাউডার শুটকি মাছে, কলা ও পেপে পাকানোর জন্য ইথাইলিন অক্সাইড, ইউরিয়া (সার) চাউলের সৌন্দর্য বাড়াতে, আলকাতরা মিষ্টি ও কাপড়ের রঙে, ইটের গুড়া শুকনা মরিচ ও হলুদের সাথে, কাঠের গুড়া খোলা চায়ের সাথে, ডালডা ঘিতে ভেজাল করা হয়। এমনকি গুড়, মুডি চকলেট, মিষ্টি, আইসক্রীম ও সরবতের জুস, প্যাকেটজাত ফলের রস ইত্যাদি বিষাক্ত দ্রব্য মিশ্রিত করে আকর্ষনীয় করে বিক্রি করার মাধ্যমে দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষের অজান্তেই মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ করছে। বিষাক্ত ফলমূলসহ নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস ভক্ষণ করে ঔষধের দোকান ও হাসপাতালে ভিড় জমাচ্ছে লক্ষ লক্ষ মানুষ। মাত্রাতিরিক্ত ঔষধ সেবনেও ক্ষতিকারক প্রভাব পড়ছে স্বাস্থ্যের উপর। আমাদের দেশী ফলের মধ্যে আম, লিচু ও পেপে এবং বিদেশ হতে আমদানীকৃত ফল, যেমন; আপেল, নাশপাতী, আঙ্গুর এবং খেজুর ইত্যাদিতে ফরমালিন ব্যবহার করে মাসের পর মাস পচন রোধ করে থাকে অধিক মুনাফা লোভী একশ্রেনীর ব্যবসায়ীরা।

রাজশাহী, চাপাইনবাগঞ্জ ও দিনাজপুরের বিভিন্ন আম ও লিচুর বাগানে মুকুল আসার পর ৫-৬ বার বিষাক্ত কেমিক্যাল ¯েপ্র করা হয়। এতে তেমন সমস্যা নেই। তবে বিষ প্রয়োগের পরপর সেগুলি বাজারজাত করা মারাত্মক। আকার্ষনীয় রং যার যত বেশী সেখানে বিষাক্তের পরিমাণও বেশী। মানব দেহের জন্যও ক্ষতিকারক একই সঙ্গে আম পাকার পর পঁচন রোধ কল্পে নিয়মিত ফর্মালিন ¯েপ্র করে অসাধু ব্যবসায়ীরা। ক্যালসিয়াম কার্বাইড মানুষের চামড়ায় ক্ষতের সৃষ্টি, কিডনী ক্যান্সার, মস্তিস্কেও ক্ষতিসাধন এবং গর্ভবতী মায়ের সন্তান হতে পারে বিকলাঙ্গ। কতিপয় ব্যবসায়ী রমজান মাসের ইফতারীতেও বিষাক্ত বিভিন্ন রংগের কেমিক্যাল মিশ্রিত করে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করার জন্য।

২০১২ সালের ডিসেম্বর মাসে  মহাখালী ইনস্টিটিউট অব ফুড সায়েন্স এন্ড টেকনোলজি পৃথকভাবে দেশী বিদেশী বিভিন্ন কোম্পানীর জুসের নমুনা পরীক্ষা করে দেখতে পায় যে ফলের জুসে সামান্যই ফল থাকে যা অত্যন্ত নিম্নমানের। এ সকল জুসের কৃত্রিম রং ও ঘ্রাণ বৃদ্ধির জন্য রাসায়নিক দ্রব্য মেশানো হয়। বিভিন্ন তথ্যে জানা যায় কাঁচা আম পাকাতে সোডিয়াম, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম কার্বাইড ব্যবহার করে। টমেটো পাকাতে ইরাথ্রোসিন, ফর্মালিন ও মেটালিন ইয়োলো মিশানো হয়। সকলের জন্য বিশেষ করে বাচ্চাদের অতি প্রিয় জুসের সাথে নিষিদ্ধ সোডিয়াম সাইক্লোমেট, কাপড়ের রং, সাইট্রিক এসিড ও প্রিজারভেটিভ ব্যবহার করা হয়। অম্লতা বাড়াতে ফসফরিক এসিড এবং ঠান্ডা রাখতে ইথাইলিন গ্লাইকল মিশ্রিত করে জুস বাজার জাত করা হচ্ছে যা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। বড়ই পরিতাপের বিষয় গত বছর (২০১২) কনজুমার এ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সূত্রমতে ৮টি কোম্পানীর ১২টি ব্রান্ডের জুস বিএসটিআই এর ল্যাবরেটরীতে পরীক্ষান্তে দেখা যায় ঐ জুসে ফলের কোন অস্তিত্বই নেই। বিএলআরআই এক প্রতিবেদনে প্রকাশ গবাদি প্রাণির খাদ্যে স্বল্পমাত্রায় এন্টিবায়োটিক, হরমোন ও কীটনাশক মেশানো হয়। যা পরোক্ষভাবে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকারক।

দীর্ঘদিন খেলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ধীরে ধীরে কমে যাবে, শিশুরা বুদ্ধিপ্রতিবন্ধীতে আক্রান্ত হয়। দেশের বিশিষ্ট শিশু কিডনী বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. মোয়াজ্জেম হোসেন ও কিডনী রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক হারুন-অর-রশীদের তথ্যমতে ১০ বছর আগে দেশে কিডনী রোগীর সংখ্যা ছিল ৮০ লাখ। এখন এ সংখ্যা দুই কোটির অনেক বেশি এবং তাদের অর্ধেকই শিশু। এছাড়া দেশে বছরে ৮৪ হাজার মানুষ নতুনভাবে ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে ভেজাল খাদ্য খেয়ে। উল্লেখ্য গত ২০১২ সালে দিনাজপুরে ৪ জন শিশু মারা যায় বিষ মিশ্রিত লিচু খেয়ে। বাগানের মালিকের শিশুও মারা যায় ঐ ফল খেয়ে। এক প্রতিবেদনে প্রকাশ বিষাক্ত খাবারের কারণে বাংলাদেশে প্রায় ৬ শতাংশ দম্পতি বন্ধ্যা এবং ১০ শতাংশ মানুষ প্রতিবন্ধীর শিকার। খাদ্য ও ফলমুলে ব্যবহারকৃত বিষের প্রভাবে ক্যান্সার, ডায়াবেটিস, কিডনী রোগ, লিভার সিরোসিস ও হৃদরোগ প্রভৃতি মরণ ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে অকালে ঝরে যাচ্ছে অনেক মূল্যবান জীবন যা সাধারণ মানুষ বুঝতেও পারছেন না। শুধু তাই নয় বন্ধ্যাত্ব ও বিকলাঙ্গ শিশুর জন্মহার বাড়ছে।  এ ক্ষেত্রে বেশী ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে এদেশের ধনী শ্রেনী, কারণ হিসেবে বলা যায় বিদেশী ফল ও  ফাষ্টফুডে এ শ্রেণীই বেশী অভ্যস্ত।

গবেষকরা বলেছেন মানুষের শরীরে ০.২ মাইক্রোগ্রাম বিষ সহনীয় হলেও বিভিন্ন শ্রেনী ও পেশার মানুষের রক্তে পাওয়া গেছে সর্বনিম্ন ১.৬ মাইক্রোগ্রাম এবং সর্বোচ্চ ৯.৭ মাইক্রোগ্রাম যার ৯০ শতাংশ শরীরের চর্বিতে মিশে আছে যা ২০ বছরেও নষ্ট হয় না। ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (বিএসটিআই) এর তথ্যে জানা যায় ভ্রাম্যমান আদালত প্রতিবছর প্রায় ১৮২২ টি ক্রিমিন্যাল কেস থেকে প্রায় ৪ কোটি টাকা আদায় করে থাকেন। ২০০৪ সালের  এক রিপোর্টে প্রকাশ ৭৬ শতাংশ খাদ্যের মধ্যেই ভেজাল রয়েছে। আইসিডিডিআরবি এর তথ্যানুযায়ী পঞ্চাশ শতাংশ তৈরী খাদ্য সামগ্রীর মধ্যেই কাপড়ের রং পাওয়া যায়, যা মানব দেহের পাকস্থলীতে ক্ষতের সৃষ্টি করে। বিভিন্ন তথ্য থেকে প্রতিয়মান হচ্ছে খাদ্যদ্রব্য ফলমূলের বিষাক্ত অভিশাপ হতে বাঁচতে হলে প্রয়োজন জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং সঠিক আইন ও এর বাস্তবায়ন।

ইতিপূর্বে খাদ্যে ফরমাণি ব্যবহারের অপরাধে তেমন কোন আইন ছিল না। তবে ১৯৫৯ সালের জাতীয় ভোক্তা অধিকার আইন ও পিউর ফুঢ অর্ডিনেন্স আইন এবং ১৯৭৪ সালের ঝঢ়বপরধষ চড়বিৎ অপঃ নামে আইন বিদ্যমান আছে। এ আইনে ফরমালিন অপব্যবহারকারীর শাস্তি ৩ বছর জেল ও ২ লক্ষ টাকা অর্থ দন্ডের বিধান রয়েছে। এ বছর বর্তমান সরকার ফরমালিন অপব্যবহারকারীর সর্বোচ্চ শাস্তি ১৫ বছর ও এক লক্ষ টাকা জরিমানার বিধান করে নতুন আইন তৈরী করেছেন, যা যুগোপযোগী। তবে সঠিক বাস্তবায়ন প্রয়োজন। ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) এ বছর হতে এককভাবে ফরমালিন আমদানীর সিদ্ধান্ত নেওয়ায় ইতি মধ্যেই এর আমদানী হ্রাস পেয়েছে বলে জানা যায়। উল্লেখ্য ইতি পূর্বে সঠিক আইন না থাকায় বছরে প্রায় ৫০০ মেট্টিকটন, ফরমালিন আমদানী হত। চলতি অর্থ বছরের অর্ধেক সময়ে আমদানীর পরিমান হ্রাস পেয়ে দাড়িয়েছে মাত্র ৮৭ মেট্টিকটন। বর্তমান আইনে ফরমালিন বিক্রয়ের ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের বানিজ্য মন্ত্রণালয় হতে লাইসেন্স সংগ্রহ করা বাধ্যতামুলক।

নতুন আইনের সঠিক প্রয়োগ ও এর বাস্তবায়নের ফলে বিগত দিনের ন্যায় যত্রতত্র এর প্রাপ্ততা হ্রাস পাবে। ভবিষ্যতে ফল মূল, টমেটো, মাছ, মাংসসহ বিভিন্ন খাদ্যে ফরমালিনের যথেচ্ছ ব্যবহার হ্রাস পাবে। ফরমালিন একটি কেমিক্যাল যা মেডিক্যাল ও ভেটেরিনারি চিকিৎসা বিজ্ঞানের পরীক্ষাগারে শিক্ষার্থীদের পাঠদানের নিমিত্তে মৃত মানুষ ও গবাদি প্রাণির অঙ্গ প্রতঙ্গ সংরক্ষণ করার কাজে ব্যবহৃত হয়। প্রকৃত পক্ষে গবেষণার জন্য প্রয়োজন মাত্র ১০০ মেট্টিকটন। অর্থাৎ বাকী ৪০০ মেট্টিকটন ফরমালিন মানব দেহে বিভিন্ন খাদ্যের মাধ্যমে প্রবেশ করে ক্ষতিসাধন করে (তথ্যঃ institute of public health)।

আইন প্রয়োগকারী সংস্থা বিশেষ করে ভ্রাম্যমান আদালত ও র‌্যাব  প্রতিবছরই শতশত মন বিষাক্ত আম, মাছসহ বিভিন্ন খাদ্য সামগ্রী জব্দ ও ধ্বংস করে থাকেন। এর পরও অসাধুব্যবসায়ীরা তাদের অপতৎপরতা চালিয়েই যাচ্ছে। বিষাক্ত ফলমূল ও খাদ্যের অভিশাপ হতে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য ফলমূল, টমেটো, কাচামরিচ, শষা ও বেগুন ব্যবহারের পূর্বে পানিতে ডুবিয়ে রাখুন কমপক্ষে ১ঘন্টা। দোকানে তৈরীকৃত ফাস্টফুড ও জুস ছেড়ে দিওয়াই উত্তম উপায়।  তবে কিছুটা আশার আলো হচ্ছে ঢাকাসহ কয়েকটি শপিং সেন্টারে ফরমালিনমুক্ত ফলমূল, শাকসবজি মাছ মাংসসহ নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস বিক্রির যে ব্যবস্থা করা হয়েছে তা কতটুকু বাস্তবায়িত হবে সেটিই প্রশ্ন। ব্যবসায়ীদের মধ্যেও ভাল মানুষ আছে, বিবেকবান মানুষের পক্ষে সবকিছুই সম্ভব। এমুহুর্তেই ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুস্থ্য রাখার জন্য বিষের অভিশাপ মুক্ত হতে হবে। সে জন্য এখনই খাদ্যে ও ফলমূলে বিষ দেওয়া রোধ করার কার্যকরপদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। আইনের যথাযথ প্রয়োগ সকলকে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও নিজের বিবেকের কাছে সৎ ও নিষ্ঠাবান হতে হবে। তবেই সকল সমস্যা দূরীভূত হবে।

খাদ্য ও ফলমূলে বিষঃ রোধ করতে হবে এখনই

লেখকঃ প্রফেসর ডা.মো.ফজলুল হক

চেয়ারম্যান ,মেডিসিন,সার্জারী এন্ড অবস্ট্রেটিক্স বিভাগ,

হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ,দিনাজপুর।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Wordpress Social Share Plugin powered by Ultimatelysocial