মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ জরুরি

মেয়ের  অভিভাবকরা সব সময়ই চিন্তায় থাকেন—তাঁর মেয়ের বর যেন মাদকসেবী না হয়। গরিব, কিন্তু চরিত্রবান হলেও আপত্তি নেই। কয়েক লাখ পরিবার ধ্বংস ও লক্ষাধিক বিবাহবিচ্ছেদ ঘটেছে মাদকের কারণে। আমার এক শিক্ষকের (বিশ্ববিদ্যালয়ের) মাদকসেবী সন্তান মাদকের টাকা না দেওয়ার কারণে লাঠির আঘাতে মাকে হত্যা করে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিশেষ করে র‌্যাবের অভিযান অব্যাহত থাকায় মাদক চোরাচালানি ও কারবারিরা জীবনের ভয়ে আত্মগোপন করছে। নিজের বিবেকের কাছে প্রশ্ন করুন, জীবন ও জীবিকার জন্য একজন মানুষের কত টাকার প্রয়োজন? এ কারবার ছাড়াও অনেক ভালো ও সম্মানজনক ব্যবসা আছে। প্রত্যেক মাদক কারবারি নিজের সন্তানদের মাদক থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করে, অথচ অন্যের সন্তানদের ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

মাদক একটি মৃত্যুফাঁদ। এ ফাঁদে যে একবার পা দেবে তার অকালমৃত্যু অবধারিত। একজন মাদকসেবী তার মা-বাবার প্রতি অকৃতজ্ঞ হয়ে ওঠে। সে মা-বাবাকে হত্যা করতে একটুও দ্বিধা বোধ করে না, যার অসংখ্য প্রমাণ এ দেশেই আছে। সে তার নিজের জীবনের জন্য পীড়াদায়ক, সমাজের জন্য আতঙ্ক, মা-বাবার জন্য বোঝা ও ভয়ের কারণ, রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতির কারণ। মাদকের অর্থ জোগান দিতে মা-বাবার ওপর নিয়মিত চাপ থাকে। টাকা না পেয়ে চুরি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, ডাকাতি, বাসাবাড়ির আসবাবপত্র, স্বর্ণালংকারসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র বিক্রি করে অর্থ জোগাতে মরিয়া হয়ে ওঠে। যৌতুক আদায়ের নামে শ্বশুর ও স্ত্রীর ওপর অত্যাচার মাদকসেবীদের একটি সাধারণ কৌশল। একটি দেশ ও জাতিকে ধ্বংস করার অন্যতম মাধ্যম মাদক। ইসলাম ধর্ম মতে, মাদক সেবনকে হারাম করা হয়েছে। (সুরা মায়েদা, ৯০; সুরা নিসা, ৪৩ ও বুখারি শরিফ-৫১৯৭)

ইয়াবা এখন এক আতঙ্কের নাম। ইয়াবা উৎপাদনকারী দেশ মিয়ানমার হওয়ায় বাংলাদেশ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। বুদ্ধি-বিবেক যাদের কম, তারাই এ পথে পা বাড়ায়। সচেতন ব্যক্তি, যাঁদের সামান্যতম জ্ঞান আছে এবং যাঁরা ভালো-মন্দ বোঝেন তাঁরা স্বেচ্ছায় মৃত্যুর ঝুঁকিতে পা বাড়াবেন না, এটাই স্বাভাবিক।

আশির দশক থেকেই ফেনসিডিল ও হেরোইন চোরাই পথে ভারত থেকে এ দেশে আসত, এখনো আসছে। ইয়াবা প্রবেশ করছে মিয়ানমার থেকে। ২০০৮ সালে ৩৬ হাজার ইয়াবা বড়ি ধরা পড়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে। ২০০৮ সাল থেকে এযাবৎ ১০ কোটির বেশি ইয়াবা বড়ি জব্দ করা হয়েছে। বাংলাদেশ এমন একটি দেশ, যার যাতায়াতের জন্য রয়েছে বিশাল সমুদ্রবন্দর ও জলসীমানা। নদী-নালা, খাল-বিল হয়ে প্রবেশ করে শহর-বন্দরে। মিয়ানমার থেকে নৌকায় নাফ নদ পার হলেই কক্সবাজার। সেখান থেকে সহজেই ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে।

বর্তমানে বাংলাদেশে মাদক কারবারির সংখ্যা ১৪ হাজারের বেশি এবং মাদকসেবীর সংখ্যা প্রায় ৭০ লাখ, যাদের মধ্যে কিছু স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী, কর্মকর্তা-কর্মচারী, এমনকি দু-একজন শিক্ষকও খুঁজে পাওয়া যায়। মাদক আমদানিতে প্রতিবছর প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হচ্ছে। প্রায় ৬০ শতাংশ মাদকের অর্থ জোগাতে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, হত্যা, ধর্ষণসহ বিভিন্ন অসামাজিক কাজে লিপ্ত রয়েছে ওই শ্রেণিটি।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সামরিক বাহিনীর সেনাদের ঘুম হারাম করে কর্মক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য মেথামেফেটামিন (ইয়াবা) ব্যবহার করা হয়। যুদ্ধের পর এটি যখন সাধারণ মানুষের নাগালে চলে যায় এবং কয়েক বছরের মধ্যেই মাদকসেবীরা অকালে মৃত্যুর পথযাত্রী হতে থাকে। তখন ইয়াবা জাপানে নিষিদ্ধ করা হলেও ছড়িয়ে পড়ে গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল নামে খ্যাত মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, ফিলিপাইনসহ বিভিন্ন দেশে। ১৯৭০ সালে নিয়ন্ত্রিত পদার্থ আইনে মেথামেফেটামিন (ইয়াবা) ব্যবহার জাপানে নিষিদ্ধ করা হয়। জাপানিদের মতে, ইয়াবা আণবিক বোমার চেয়েও মারাত্মক। ১৯৪৫ সালের ৬ ও ৯ আগস্ট ফ্যাটম্যান ও লিটল বয় নামের দুটি আণবিক বোমা আঘাত হানে হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে। ফলে দুই লাখ ১৪ হাজারের বেশি জাপানি সেকেন্ডের মধ্যে মৃত্যুবরণ করে। এক অর্থে ইয়াবা আণবিক বোমার চেয়েও মারাত্মক। কারণ মাদকসেবী নিজে ধুঁকে ধুঁকে মরে, অন্যের ক্ষতি করে, মা-বাবা ও সমাজের জন্য বোঝা, সমাজকে কলুষিত করে এবং রাষ্ট্রের উন্নয়ন ও সুনামকে হেয় প্রতিপন্ন করে।

মিয়ানমার ইয়াবা তৈরি ও সরবরাহে বিশ্বে প্রথম স্থানে রয়েছে। আমাদের দুর্ভাগ্য যে তারাই আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র। বিভিন্ন দেশে ছদ্মনামে ইয়াবা; যেমন—পাগলা মাদক (থাইল্যান্ড), ইয়াবা (মিয়ানমার), হর্স ড্রাগ (বার্মিজ), বাবা, ইয়াবা (বাংলাদেশ), বুলবুলিয়া (ভারত), মাগো (চীন) নামে পরিচিত। এতে রয়েছে মেথামেফেটামিন ও ক্যাফিন। মিয়ানমার বিশ্বের বৃহত্তম মেথামেফেটামিন উৎপাদক ও সরবরাহকারী দেশ। তারা বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে ইয়াবা সরবরাহ করে দেশের যুবসমাজকে ধ্বংস করার মহাষড়যন্ত্রে লিপ্ত।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারেই মাদকের ছোবল থেকে যুবসমাজকে রক্ষা করার জন্য কঠিন ও যুগোপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। জিরো টলারেন্স নীতি অবলম্বন করছেন। এর আগে জঙ্গিদের কারণে মানুষ মসজিদ ও ঈদের মাঠে যেতেও ভয় পেত, এমনকি বাস ও ট্রেনে যাতায়াতও নিরাপদ ছিল না। বর্তমান সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি অবলম্বনের ফলে মানুষ অনেকটাই চিন্তামুক্ত ও আশাবাদী। বর্তমান সময়ে মাদক কারবারি ও মাদকসেবী ছাড়া প্রায় সবাই এ অভিযানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। জনগণ মাদকের অভিশাপ থেকে নিজের সন্তান, দেশ ও সমাজকে বাঁচাতে চায়। সবার মধ্যে আত্মবিশ্বাস রয়েছে যে শেখ হাসিনা ও তাঁর সরকারই এ জটিল সমস্যার সমাধান দিতে সক্ষম; যার প্রমাণ অনেক।

মাদক একটি আন্তর্জাতিক সমস্যা। সমাধান করতে হবে আন্তর্জাতিকভাবে। মাদক উৎপাদন ও সরবরাহকারী দেশগুলোর তালিকা তৈরি করতে হবে। প্রয়োজনে জাতিসংঘের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন হতে পারে। মাদকের ছোবলে শুধু বাংলাদেশই নয়, সারা বিশ্বই আক্রান্ত। এটি এক ধরনের মারণাস্ত্র, যা একটি জাতিকে স্লো পয়জনের মতো নিঃশেষ করে দিতে পারে। তা-ই হচ্ছে। মাদক নিয়ন্ত্রণে দল-মত-ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে সবাইকে একই প্ল্যাটফর্মে অবস্থান নিতে হবে। সরকারের এ উদ্যোগকে স্বাগত জানাতে হবে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কাজের স্বার্থে সঠিক তথ্য প্রদান করতে হবে। এটি দল-মত-নির্বিশেষে সবারই নৈতিক দায়িত্ব।

কালের কন্ঠে প্রকাশিত ২৪ জুন ২০১৮

http://www.kalerkantho.com/print-edition/muktadhara/2018/06/24/650329?fbclid=IwAR3eJ-vs3aL0iomDUF1cz0J62AmnAx_cwfc6LqTeDZ23e2m2zA-RTIlolJY

লেখক : ডিন, ভেটেরিনারি অ্যান্ড এনিম্যাল সায়েন্স অনুষদ, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, দিনাজপুর

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Wordpress Social Share Plugin powered by Ultimatelysocial