সড়ক দুর্ঘটনায় আর কত মৃত্যু?

বর্তমানে কলমের গতির চেয়ে বেশী গতিতে জন্ম নিচ্ছে বিভিন্ন ঘটনাবলী, তার মধ্যে দুর্ঘটনা অন্যতম। এ লেখা তৈরির পরও ঘটে গেছে আরও কয়েকটি দুর্ঘটনা। মিরসরাইয়ে ট্রাক দুর্ঘটনায় ৪৪ জন কিশোর শিক্ষার্থীর অপ্রত্যাশিত মৃত্যুতে দেশব্যাপী নেমে আসে শোকের ছায়া। ওই সব শিক্ষার্থী একদিন উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে পিতা-মাতা ও দেশকে সেবার সুযোগ পেত। মাতা-পিতা হতেন গর্বিত। বর্তমান দেশ তাদের সেবা থেকে চিরতরে বঞ্চিত। আমরা তাদের অকাল মৃত্যুতে গভীরভাবে মর্মাহত।

মিরসরাইর পর এ পর্যন আরও প্রায় অর্ধ শতাধিক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে প্রায় ৯৫ জন এবং আহত হয়েছে প্রায় দুই শতাধিক। এর মধ্যে ২৮ জুলাই পর পর তিনটি দুর্ঘটনায় ২৮ জন নিহত ও প্রায় ৭০ জন আহত হয়েছেন। গাড়ি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে ছয়টি। এমনিভাবে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ নিহত ও আহত হয়ে দূর্বিসহ জীবন কাটাচ্ছে মুলত চালকের ভুল ও খামখেয়ালীর কারণে। এ ধরনের ঘটনা প্রতিদিনই ঘটছে। প্রতিদিনই পত্রিকার পাতায় দেখা যাচ্ছে সড়ক দুর্ঘটনার চিত্র। ফ্রেব্রুয়ারী, ২০১০ টাঙ্গাইলে এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় মারা যান থাই ডেপুটি এ্যামবেসেডর পন্নী লিকানা জুলি, যা অত্যন্ত দুঃখ ও লজ্জাজনক। বিভিন্ন পরিসংখ্যানে যে তথ্য পাওয়া যায়, তা প্রকৃত সংখ্যার সাথে সংগতিপূর্ণ নয়। ২০০৯ সালের বিবিসির তথ্যানুযায়ী সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান প্রায় ১২ হাজার জন এবং প্রতি বছর গড়ে ৫ হাজার জন। এক জরিপে জানা যায়, ৫৫৪ টি দুর্ঘটনার জন্য প্রায় ৯৯ ভাগ দায়ী চালক নিজেই।

২১ জুলাই নরসিংদীতে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাওয়া একই পরিবারের ৫ জন রেখে গেছেন অবুঝ সুফিয়ান নামক ২ বছরের অবুঝ শিশুকে। একজনের মৃত্যু মানেই ওই পরিবারের সবার আজীবন মৃত্যুজ্বালা বহন করা। একজন মানুষের মৃত্যু এমনও হতে পারে, একমাত্র সন্তানের মৃত্যু। এ ধরনের শোকের ভার পিতামাতা সইবেন কিভাবে? বিদেশ থেকে আমদানী করা হচ্ছে ওই দেশের অকেজো বলে বিবেচিত গাড়ী। রঙ করে চালানো হচ্ছে বছরের পর বছর। প্রত্যেক বছরই আমদানির সংখ্যা বাড়ছে, সেই সাথে বাড়ছে যানজট। তেমনি বাড়ছে ড্রাইভারের চাহিদা। ফলে কেউ চালকের ছিটে বসলেই হয়ে যায় ‘ড্রাইভার সাহেব’। এ ধরনের ঘটনার পূণরাবৃত্তি যেন আর না ঘটে। শক্ত আইন ও এর সঠিক বাস্তবায়ন সময়ের দাবী। দুর্ঘটনার মূল কারণের মধ্যে রয়েছে হেলপার দ্বারা গাড়ী চালানো, ড্রাইভারের অদক্ষতা ও অসাবধানতা, চলন্ত অবস্থায় মোবাইল ফোন ব্যবহার করা, চালকের সঙ্গে সাইডটক করা এবং মাদকাশক্ত ড্রাইভার দ্বারা গাড়ি চালানো। ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত মাল বোঝাইয়ের কারনেও দুর্ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনার অন্যান্য কারণের মধ্যে রয়েছে অপ্রশস্ত রাস্তা ও কালভার্ট, ট্রাফিক আইন মেনে না চলা, জনসাধারনের ওভারব্রীজ ও জেবরা ক্রসিং ব্যবহার না করা, গরু- ছাগল-ভেড়া-কুকুরের রাস্তা পারাপার ইত্যাদি। কালভার্ট গুলোর অধিকাংশই রাস্তার চেয়েও চাপা, যেখানে দুটি গাড়ী পাশাপাশি অস্থান করলে জায়গা থাকে না। বর্তমানে চার লেন বিশিষ্ট রাস্তা হলে দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমে যাবে। নসিমন ধরনের শ্যালো ইঞ্জিনচালিত বাহনকে সাইড দেয়ার সময় ঘটে অনেক দুর্ঘটনা। কারন এর চালকরা হয়ে থাকে কখনও ড্রাইভার, কখনও হেলপার আবার কখনও চায়ের দোকানের কর্মচারী ইত্যাদি। এ পর্যন্ত শত শত দুর্ঘটনার হোতা নছিমন ও ট্রাক।

প্রতিদিন গড়ে ২/৩টি দুর্ঘটনা ঘটছে। প্রতি বছর প্রায় এক থেকে দেড় হাজার গাড়ি দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। এ থেকে নিস্তারের উপায় কী? প্রথমত, রাস্তায় গাড়ি বের করার আগে যান্ত্রিক ক্রুটি আছে কি না তা সুচারুরূপে খতিয়ে দেখা। কেবল দক্ষ, অভিজ্ঞ ও শিক্ষিত ড্রাইভারকে লাইসেন্স প্রদান সাপেক্ষে গাড়ি চালাতে দেয়া যেতে পারে। চালককে ধুমপান সহ মাদক হতে বিরত থাকতে হবে। এ ক্ষেত্রে নিয়ামিত রক্ত পরীক্ষা করতে হবে। দুরপাল্লার প্রতিটি গাড়িতে দু’জন অভিজ্ঞ ড্রাইভার থাকা একান্ত প্রয়োজন। ড্রাইভার ও হেলপারের জন্য নির্ধারিত ড্রেস ব্যবহার করার বিধান রাখা যেতে পারে, যাতে ড্রাইভারের আসনে হেলপার বসতে না পারে।

দ্বিতীয়ত, চার লেন বিশিষ্ট রাস্তার মাঝখানে ডিভাইডার স্থাপন করা এবং ডিভাইডারের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের গাছ লাগানো প্রয়োজন যাতে রাতে বিপরীত দিক হতে আসা গাড়ীর লাইট চোখে না লাগে। রাস্তার বাঁক বা মোড়ের পার্শ্ববর্তী গাছ কেটে পরিস্কার রাখতে হবে, যাতে মোড় ঘোরার সময় বিপরীত দিক হতে আসা গাড়িগুলো সহজেই দৃষ্টিগোচর হয়। মোড় ঘোরার সময় গাড়ির গতি কমিয়ে আনতে হবে। যাত্রী ওঠা-নামার জন্য রাস্তার নির্ধারিত স্থানে ডাইভারশন স্পেস রাখতে হবে। তেলের পাম্পের প্রবেশ ও বহিরাগমন পথ ক্রমান্বয়ে বড় রাস্তার সঙ্গে মিলিত হতে হবে। মহাসড়ক থেকে কম পক্ষে ১০০ গজ দুরে হাট-বাজারের অবস্থান থাকতে হবে। বাস বা ট্রাকে ধারন ক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী ও মাল বোঝাই করা যাবে না। গুরুত্বপূর্ন স্থানে ভ্রাম্যমান আদালতের ব্যবস্থা রাখতে হবে। মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে ট্রাকের মালের ওজন নির্ধারণী যন্ত্রের ব্যবস্থা রাখতে হবে।

তৃতীয়ত, রিকশা ও ভ্যান অপসারন করে চালকদের অন্য কাজের সংস্থান করতে হবে। মহাসড়কে নছিমন ও যন্ত্রচালিত যাত্রীবাহী ভ্যান চালানো বন্ধ করতে হবে। মনে রাখতে হবে, দুর্ঘটনায় শুধু যাত্রীরই ক্ষতি হয় না-ড্রাইভার, হেলপার, সুপারভাইজারেরও ক্ষতি হয়। অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় মালিক। অভাবের ঘানি টানতে হয় অন্য সদস্যদের।

চতুর্থত, সবাইকে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। ড্রাইভারকে অনুধাবন করতে হবে, তার দায়িত্বে রয়েছে ৪০-৫০ জন যাত্রী অর্থাৎ ভুলের কারণে দুর্ঘটনা হলে কম-বেশী সবাই শারীরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত এমনকি কারও জীবনহানিও ঘটতে পারে। চালককে তার নিজের জীবনকেও ভালবাসতে হবে যেহেতু এ ওপর নির্ভর করছে একটি পরিবার।

সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাচ্ছেন অনেক চাকুরীজীবি, সাাংবাদিক, রাজনীতিক ও মিডিয়া ব্যক্তিত্বসহ বিভিন্ন স্তরের মানুষ। এ ধরনের অকাল মৃত্যু দেশ ও পরিবারের জন্য অভাবনীয় ক্ষতি। দূর্ঘটনায় আহত ব্যক্তি নিজের এবং পরিবারের অন্য সদস্যদের জন্য পিড়াদায়ক ও বোঝা হয়ে উঠেন। তাই সুস্থ মন ও ধের্যের সঙ্গে গাড়ি চালাতে হবে। তবেই দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব।

লেখক-ডা. মো. ফজলুল হক
সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় চেয়ারম্যান
মেডিসিন, সার্জারী এন্ড অবস্টেট্রিক্স বিভাগ
হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, দিনাজপুর

প্রকাশিতঃ দৈনিক যুগান্তর, তারিখ ০৩/০৮/২০১১ ইং।

সড়ক দুর্ঘটনায় আর কত মৃত্যু

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares