অপহরণ-গুমের পিছনে রয়েছে অর্থ: অধ্যাপক ডাঃ ফজলুল হক

দেশে অব্যাহত অপহরণ, হত্যা ও গুমের ঘটনায় সব শ্রেণীর মানুষের মধ্যে আতংক ও উৎকন্ঠা তৈরী হয়েছে। রাস্তায় বা মাঠে ঘাটেই শুধু নয় বাসাবাড়ি থেকেও র‌্যাব-ডিবি পুলিশের নাম ভাঙ্গিয়ে অপহরণ, ছিনতাই, চাঁদাবাজি সহ বিভিন্ন অপকর্ম করে যাচ্ছে অপহরণকারীরা। অনেক বছর যাবৎ এ ধরনের ঘটনা চলে আসছে। দিন দিন এ অপরাধ চক্রের দৌরাত্ম বেড়েই যাচ্ছে। এ অবস্থার অবসান সবার কাম্য। অন্যথায় দেশের অর্থনীতি চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্থ্য হবে, ব্যাহত হবে জীবন জীবিকা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের চলমান ধারাবাহিকতা। বর্তমান পরিস্থিতির অবসানকল্পে সব শ্রেণির নাগরিকদের স্বতঃস্ফুর্তভাবে এগিয়ে আসতে হবে দায়িত্বশীল ভূমিকা নিয়ে।

দেশে শক্তিশালী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী থাকার পরও এ ধরনের ঘটনা কেন ঘটছে? গুম-খুন-অপহরণের চলমান ঘটনায় কোনভাবেই নিরাপত্তা বাহিনী তাদের দায়-দায়িত্ব অস্বীকার করতে বা এড়িয়ে যেতে পারেন না। দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি দেশের ভাবমূর্তিও আজ প্রশ্নবিদ্ধ। পাল্টাপাল্টি দোষারোপ পিছনে ফেলতে হবে। প্রধানমন্ত্রী স্পষ্টভাবে ষোঘণা দিয়েছেন, অপরাধী যে দলেরই হোক না কেন তাকে শাস্তি পেতেই হবে। তিনি নারায়ণগঞ্জের খুনের ঘটনায় খুনিদের খুজে বের করার নির্দেশ দিয়েছেন। তত্বাবধায় সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. আকবর আলী খান বলেন, গুম-অপহরণ হঠাৎ করেই বাড়েনি, দীর্ঘদিন ধরেই চলে আসছে। কারণ হিসেবে বলেন, একটি প্রশাসনের অবক্ষয়, অন্যটি রাজনৈতিক কারণে। পবিত্র কোরআন শরীফে উল্লেখ রয়েছে, হে বিশ্বাসীগণ! তোমাদের আপনজন ছাড়া অন্য কাউকেও বন্ধুরুপে গ্রহণ করো না। তারা তোমাদের বিভ্রান্ত করতে ত্রুটি করবে না। তোমাদের ক্ষতিই তাদের কাম্য, তাদের মুখে বিদ্বেষ প্রকাশ পায়, যা তাদের অন্তরে গোপন রাখে। (সুরা আল-ইমরান, আয়াত নং১১৮)। উল্লেখ্য, একই কায়দায় র‌্যাব পুলিশের পোশাক পরে নামীদামী গাড়ীতে উঠিয়ে স্কসটেপ বা চেতনানাশক দ্বারা অচেতন করে চোখে রুমাল বেধে, শারীরিক অত্যাচার করে মুক্তিপণ আদায় বা হত্যা করে লাশ গুমসহ অসহনীয় ঘটনা ঘটছে, যার শেষ কোথায়?

দেশের স্থিতিশীল পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে বা ধরে রাখতে দল-মত-নির্বিশেষে সকলের সহযোগিতা অপরিহার্য । দেশের স্বার্থেই সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সহযোগিতা দিতে হবে। অন্যথায় ইতিবাচক এর পরিবর্তে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে সব ক্ষেত্রে। ভবিষ্যতে মাত্রা বেড়েই যাবে, যা ক্যান্সার সমতুল্য। এর দায়ভার চেপে বসবে বর্তমান ও ভবিষ্যত প্রজন্মের ওপর। নারায়ণগঞ্জ শিল্পাঞ্চল হওয়ায় বিভিন্ন চলে চাঁদাবাজি, দখল বাণিজ্য-যার কারণে উত্থান ঘটেছে প্রায় ২৬টি নতুন সন্ত্রাসী গ্রুপের (পত্রিকার তথ্যমতে)। মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার তথ্যমতে গত এপ্রিল মাসেই অপহরন ৩৪জন এবং নিখোজ রয়েছে ২৬জন। এ বিষয়গুলো ভয়াবহ ও উদ্বেকজনক।

শিশু অপহরণে গৃহকর্মী, পরিচিতজন, নিকট আত্মীয়রাই বেশী জড়িত থাকতে দেখা যায়। মেয়েদের অপহরণ করা হয় বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে বা ভাল চাকুরির কথা দিয়ে। পাচার করা হয় অন্যান্য দেশে। এদের পরিণতি ভয়াবহ ও অসম্মানের। অনেকেই জেলাখানায় মানবেতর জীবনযাপন করে মূল্যবান জীবন শেষ করছে চোখের জলে। মাঝে মাঝে মানবাধিকার সংগঠনের তৎপরতার কারণে জেল হতে খালাশ পেয়েছেন; কিন্তু সুস্থ জীবনে ও সংসারে সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকার অধিকারবঞ্চিত হয় অনেক মেয়েই। অপহরণ বিভিন্ন কারণে হয়ে থাকে, যেমন-মুক্তিপণ আদায়, ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব, রাজনৈতিক বিরোধ, ব্যক্তি আক্রোশ, চাঁদাবাজির ভাগাভাগি ইত্যাদি। পাহাড় ও সমুদ্রবেষ্টিত চট্টগ্রামেই অপহরণের ঘটনা ঘটে বেশি। যেমন-গত সাড়ে চার মাসে বাংলাদেশে প্রায় ৬০ জন বিভিন্ন পেশা ও বয়সের মানুষকে অপহরণ ও গুম করা হয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রামেই ২৫জন অর্থ্যাৎ প্রায় ৪০ শতাংশ। দ্বিতীয় স্থানে নোয়াখালী এবং তৃতীয় অবস্থানে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ। তবে গুমের দিক থেকে নারায়ণগঞ্জ প্রথম স্থানে। উল্লেখ্য চট্টগ্রামে শিশু এবং ঢাকা-নারায়ণগঞ্জে রাজনৈতিক দলের সদস্য, ব্যবসায়ী, ছাত্র ও আইনজীবী ইত্যাদি। সমুদ্রে অপহরণ হয়ে থাকে শ্রমজীবী মৎস্য শিকারী বা জেলেরা। অনেক সময় নৌবাহিনীর চোখকে ফাঁকি দিয়ে জাল, অর্থকড়ি, মাছ ও ট্রলার সহ সকল জেলেদের হত্যা করে, লাশ ফেলে দেয় গভীর সমুদ্রে। গত আশি ও নব্বই এর দশকে অপহরণের ঘটনা বেশী ঘটেছে পার্বত্য চট্টগ্রামে। শান্তিবাহিনীর সদস্যরাই গভীর জঙ্গলে কাঠ ব্যবসায়ী, রাস্তা উন্নয়নে কর্মরত ইঞ্জিনিয়ার, কন্ট্রাক্টর, বিদেশী সংস্থায় কর্মরত অফিসারদের অপহরণ করে নিয়ে মুক্তিপণ আদায় করা হতো। সেখানে হত্যা ও গুমের ঘটনা বিরল। দেশের মানুষের জান-মালের নিরাপত্তায় রয়েছে দক্ষ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য। আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী থেকেও এ ধরনের ঘটনা অপ্রত্যাশিত ও রহস্যাবৃত নিঃসন্ধেহে। সব অপহরণের কারণ অবশ্যই উদঘাটিত হবে বলে বিশ্বাস করি এ কারণে যে, সোনালী ব্যাংকের পাঁচ বস্তা ভর্তি ১৬ কোটি ৪৩ লাখ টাকা চুরি হয়েছে কিশোরগঞ্জের ব্যাংক থেকে, তা উদ্ধার করা হয়েছে ঢাকা থেকে। এ থেকে বোঝা যায়, সদিচ্ছা থাকলে অবশ্যই উদঘাটিত হবে, বিচার হবে। রাস্তায় গাড়ী চলবে যথারীতি। তবে যারা বিদায় নিলেন তাদের কোনদিন ফেরৎ পাওয়া যাবে না। নিকট আত্মীয় সহ মা-বাবা স্ত্রী-পুত্র-কন্যার লাভ কি হবে? হৃদয়ের ব্যথা চোখের জল এবং নির্ঘুম আজীবনের ব্যথা সহ্য করার মত নয়। স্বজনের রেখে যাওয়া স্মৃতি ভোলার নয়। এটিই বাস্তব সত্য। একটি ঘটনার বিচার কার্য বিলম্বিত হলে বা বিচার কার্য সুষ্ঠ না হলে অপরাধীরা অপরাধ চালাতে উৎসাহিত হয়। ফলে আইন শৃঙ্খলার অবনতি ঘটে। আইন চলবে তার নিজস্ব গতিতে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে ঘটনার সঠিক তথ্য-উপাত্ত-সংগ্রহ ও আইনের সঠিক বাস্তবায়নই শান্তি প্রতিষ্ঠায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে সক্ষম।

 

দৈনিক কালের কন্ঠ (উপ-সম্পাদকীয়, পৃঃ ১৪) ১৩/০৫/২০১৪অপহরণ -গুম

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *