বিবেক মানুষের শ্রেষ্ঠ আদালত -অধ্যাপক ডা.ফজলুল হক

সব অপবাদই মুছে ফেলা যায়, চুরি ও দুর্নীতির অপবাদ ছাড়া। ধর্মীয় আঙ্গিকে চিন্তা করলে এর চেয়ে নিকৃষ্টতম কাজ আর নেই। ছোট বেলায় ভাবতাম যারা চুরি ও ডাকাতি করে তারা অত্যন্ত গরীব ও অশিক্ষিত। সেকালে চুরির ধরন ছিল সিঁদকাটা বা বাঁশের বেড়া কেটে বা ঘরের ঝাপ সরিয়ে ঘরে প্রবেশ করে ধান, চাল, পাট, ডাল, আটা ইত্যাদি নিয়ে পালিয়ে যাওয়া। অনেক সময় মালিকের হাতে ধৃত চোরকে দেখলে মনে হত সে অত্যন্ত গরীব। মারতে গেলেও মায়া হত অনেকের। সে যুগে চোরের কোন চাকুরী ছিল না। তারা অত্যন্ত অনাহারি এবং গরীব। আজ কাল চোর আছে, তবে ঐ ধরনের চোর নেই। ডিজিটাল যুগে চুরির ধরন পাল্টে গেছে। বর্তমানের চোরগুলোও উন্নতমানের। কলমের মারপ্যাঁচে চুরি করে কোটি কোটি টাকা এবং চুরি পেশাটির নামও পরিবর্তিত হয়েছে। সেটি দুর্নীতি নামে সিভিল সমাজের কাছে পরিচিত।

ঘুষখোর কর্মস্থলের টেবিলে বসে মানুষের কাছ থেকে ফাইল আটকিয়ে কলাকৌশলে ঘুষ নিয়ে থাকে, যেমন- এ কাজটি আজ হবে না, ৭দিন পর আসুন, ফাইল পাওয়া যাচ্ছে না, স্যার ব্যস্ত, এ সমস্যা সে সমস্যা ইত্যাদি দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে ঘুষ দিতে বাধ্য করে। অনেক সময় ঘুষ না দিলে ফাইল গায়েবসহ বিভিন্ন সমস্যার সৃষ্টি করে। ধর্মীয়ভাবে এটি যে কত জঘণ্য কাজ তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা। টিআইবি এর তথ্যানুসারে কয়েকটি এয়ারমার্ক অফিস, যেমন- পুলিশ বিভাগ, ভূমি অফিস, পাসপোর্ট অফিস, ইনকাম ট্যাক্স, সিটি কর্পোরেশন, বিদ্যুৎ, টেলিফোন বিভাগ ইত্যাদি উল্লেখ করার মত। তাছাড়াও ঘুষ ও দুর্নীতি নেই এমন অফিসের তালিকা প্রায় শূণ্যের কোঠায়। মানুষ সৃষ্টির সেরাজীব এতে কোন সন্দেহ নেই কারণ মানুষের রয়েছে ভালমন্দ বোঝার জ্ঞান ও দক্ষতা। আল্লাহ্পাক মানুষকে ভালকাজের মর্যাদা দিয়ে থাকেন দুনিয়া ও আখেরাতে। তেমনি মন্দকাজের জন্য আল্লাহ্র কাছে তো বটেই সমাজের সাধারণ মানুষের কাছেও সে ঘৃনিত ব্যক্তিরুপে ব্যবহার পেয়ে থাকেন। পরকাল তো পরেই হবে। সেখান থেকে কেউ রেহাই পাবে না। যে ব্যক্তি ঘুষ-দুর্নীতির আশ্রয় গ্রহণ করে সে ধর্মীয় দৃষ্টিকোন থেকে পিতা-মাতার নিকট কুসন্তান ছাড়া আর কিছুই নয়। এ বিষয়ে হাদিসেও উল্লেখ আছে।

১৯৬৯/৭০ এর গণ আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়–য়া আমাদের এলাকার ৪/৫ জন ছাত্র অন্যান্য স্কুল কলেজের ছাত্র ও সাধারণ মানুষ নিয়ে ‘ঐ চোর ডাকাতদের ঘরবাড়ী আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয় এবং হত্যা করে প্রায় ১৮ জন ডাকাত। তার পর থেকে ঐ গ্রামের মানুষ চুরি, ডাকাতি ছেড়ে ভাল হলেও চোর-ডাকাতের গ্রাম নামেই পরিচিত। সমাজ তাদেরকে ভিন্ন চোখে দেখে, আন্ডারএস্টিমেট করে। এমনকি আত্মীয়তাও করতে চায় না। এটিই যদি হয় পেটের দায়ে চুরি করার জন্য তাহলে শিক্ষিত মানুষের দুর্নীতি সাধারণ সমাজ কিভাবে দেখবেন? আজ দুর্নীতিবাজ ও ঘুষ খোরের কারণে খাদ্য দ্রব্যসহ নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য অভাবনীয় উর্দ্ধগতির দিকে। এমনকি বিদ্যুৎ ও গ্যাসের লোকশানের অংশটুকুও চেপে বসছে সাধারণ গ্রাহকদের ঘাড়ে। সরকারও এ শ্রেণীর কারণে হিমশিম খাচ্ছে সব কিছু সহনীয় পর্যায়ে রাখতে। সব সরকারই চান তার আমলে দেশ ভাল ভাবে চলুক কিন্তু সম্ভব হয় না ঐ সব দুর্নীতি পরায়ন ব্যক্তিদের কারণে। বাংলাদেশ কয়েকবারই দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে যার মূলকারণ কতিপয়ের ঘুষ-দুর্নীতি। সমাজে সাধারণ মানুষ অবশ্যই অবগত আছেন অফিস-আদালতে কে কিভাবে চলছেন। অফিসে সৎ লোকের সংখ্যাও কম নয়, তারাই এদের কৃতকর্মের সাক্ষী। এরা যতই গাড়ী বাড়ী ও ক্ষমতার দাপটই দেখান না কেন মানুষ দুর থেকে তাদের ঘৃণার চোখে দেখেন। মানুষের আদালতে পার পেলেও পরকালের আদালত বড়ই কঠিন। তিলে তিলে হিসাব দিতেই হবে। সেদিন আর কত দুর? শেষ নিশ্বাস যতদুর। আমাদের সকলকে স্বস্ব স্থান হতে দেশ, সমাজ ও নিজের স্বার্থে সৎ ও আদর্শবান হতে হবে। অসৎ পয়সা কার জন্য? ঘুষ-দুর্নীতি করবেন কার স্বার্থে? এতে আপনার ব্যক্তিগত লাভ কি? টাকা গাড়ী বাড়ী আর কতটুকু ব্যবহার করা যায়? কিন্তু লোকে চোর ও ঘুষখোর বললে তখন আপনার অবস্থান কোথায় গিয়ে দাড়াবে? ছেলে-মেয়েকে যখন ঘুষখোরের ছেলে-মেয়ে বলে মানুষ অবজ্ঞা করবে তখন ছেলে-মেয়েই ধিক্কার দিবে, তখন কেমন লাগবে নিজের? হাইকোর্ট ও জর্জকোর্টের রায়ে জয়ী হলেও শেষ বিচারে পার পাওয়া যাবে না। ঘুষের টাকার কারণে ও গরমে নিজ সন্তানাদি যদি মাদকাসক্ত হয় তখন আমাদের যন্ত্রনাই বাড়বে।

তাই সৃষ্টির সেরাজীব হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলুন। ঘুষ-দুর্নীতি ছেড়ে দিন। অবৈধ অর্থের বাড়ি-গাড়িতে শান্তি নেই। অবৈধ উপার্জন থেকে বিরত থাকাই বুদ্ধিমানের কাজ। একজন সৎ লোকের গাড়ি, বাড়ি, অর্থ কম থাকলেও আত্মার শান্তির দিক থেকে সে অনেক বড়। এ বিষয়টি গভীরভাবে একবার চিন্তা করা আমাদের সবার জন্যই মঙ্গল বয়ে আনবে। আমরা সবাই ঘুষ, দুর্নীতি ও লুটপাটের মত ঘৃণিত কাজকে মন থেকে ঘৃণা করি। এদেশের ঘামঝরা শ্রমজিবী মানুষের অর্থেও রাষ্ট্র চলে, এ অর্থ অনেক কষ্টের। এ অর্থ যেন দেশ ও দেশের মানুষের স্বার্থেই ব্যয় হয় সেদিকে নজর রাখতেই হবে। তাই দেশ, জাতি, সমাজ ও ভবিষ্যত প্রজন্মের কল্যানার্থে বিগত দিনের কলঙ্কগুলো মুছে ফেলতে চাই সৎ ও দক্ষতার সাথে। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ আদালত হচ্ছে মানুষের বিবেক। এই মর্মকথাটির উপলদ্ধি যেন হয় দেশ ও জাতি গঠনের প্রধান হাতিয়ার।

দৈনিক ইত্তেফাক তারিখঃ শুক্রবার, ১৪ সেপ্টেম্বর-২০১২ ইং, পৃষ্ঠা-৮

মানুষের শ্রেষ্ঠ আদালত বিবেক

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares