ইভটিজিং বখাটেদের কাজ-অধ্যাপক ডা: ফজলুল হক

প্রবাদ আছে, পাগল নৌকা ডুবাইও না। পাগল বলে, ভাল কথা মনে করেছ, তেমনি দশা। ইভটিজিং বর্তমানে নতুন ঘটনা মনে হলেও এটি আদৌ নতুন নয়। আবহমান কাল হতেই তা চলে আসছে। কিন্তু মাত্রা অনেক কম ছিল। ১৯৭৮ সনের কথা। আমি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ডি.ভি.এম. তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। ভেটেরিনারি অনুষদে মেয়েদের প্রথম ভর্তি করা হয়। ক্লাশে শিক্ষক প্রবেশের অপেক্ষায়। আমার সামনের বেঞ্চের পরবর্তী সারিতে ছাত্রীরা বসে ছিল। আমার এক ক্লাসমেট বন্ধু এক বান্ধবীকে কিছু একটা বললেন। আমি তাকে বললাম তুই এ ধরনের কথা বলতে পারিস? বলা মাত্রই আমার কপালে জুটলো একটা ঘুসি। তাও হেভিওয়েট বক্সিং এর মতই। আমি বোকা বনে গেলাম, ও কি করল? আমিও ছাড়বার পাত্র নই। পিছন থেকে চেয়ার ছুড়ে মারলাম ঐ বন্ধুকে। তাতে তার হাতের একটি আঙ্গুল ভেঙ্গে আজও বাকা হয়ে আছে। সে বলে, তোকে ঘুষি মারতে যেয়ে আমার আঙ্গুল ভেঙ্গেছি। আমি বলি চেয়ার ছুড়ে তোর হাতের আঙ্গুল ভেঙ্গে দিয়েছি। বর্তমানে সেও একজন উর্দ্ধতন কর্মকর্তা, মাঝে মধ্যেই এ ব্যাপারে রশিকতাও করি। যা হোক এটাই যে ছোট খাট ইভ টিজিং তা বুঝতে পারলাম ৩২ বছর পর। তবে, আমি একজন সাহসী প্রতিবাদী, যেহেতু প্রতিবাদ করেছিলাম। দিন যত যাচ্ছে, ইভটিজিং এর সংখ্যা দিনদিন বাড়ছেই। বখাটে ইভটিজারদের হাতে আহত ও নিহত হয়েছেন অনেক প্রতিবাদী ব্যাক্তি। এরা পর্যায়ক্রমে মেয়েদের পিতা-মাতা, দাদা-নানা, ভাই-বোনসহ শিক্ষক-শিক্ষিকাকে বিভিন্ন সময়ে আহত ও হত্যা করছে। সত্যিকার অথের্, এদের মনুষত্ববোধ দিনদিনই হ্রাস পাচ্ছে।

৬ষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্রী রোজীনা খাতুন রুমা, বখাটে রিপন ও মোস্তফার দ্বারা ইভটিজিং এর শিকার হন। প্রতিবাদ জানানোর কারনে জীবন দিতে হলো ঐ মেয়ের নানা আবদুস সোবহান (৭৫) কে। তার বাড়ী নলেয়া গ্রাম, ভুরুঙ্গামারী উপজেলা, কুড়িগ্রাম জেলায়। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করাই সাধারণ নিয়ম। সে অভিভাবকের নিকট অভিযোগ করেছিলেন, বিচার চেয়েছিলেন। এখানে আমরা কি দেখছি, অভিভাবক তার বখাটে ছেলের বিচারের পরিবর্তে ছেলের পক্ষনিয়ে মারামরিতে অংশ নিয়ে পিটিয়ে বাড়ীর উঠানেই হত্যা করে ঐ বৃদ্ধকে। এ ধরনের পরিবারের ছেলে-মেয়েরা চরিত্র গঠনে অভিভাবক হতে পারিবারিক, ধর্মীয় ও সামাজিক শিক্ষা নেয়ার সুযোগ পাবে কী ভাবে? যেহেতু অভিভাবকের আচরণ ও তার বখাটে ছেলের আচরণ অবিকল। অনেকে বলেন, মেয়ের সাথে তার ভাব ছিল, হতেও পারে, তবে এটি মিথ্যে, কারণ ৯/১০ বছরের মেয়েদের সাথে যে কোন ছেলেদেরই ভাবের আদান-প্রদান অযৌক্তিক।

একই কারনে প্রতিবাদ করায় বিগত ১২-১০-২০১০ ইং তারিখে শিক্ষক মিজানুর রহমানকে হত্যা করা হয় নির্মমভাবে । এর ২ দিন পরেই একই ধরনের ঘটনায় ফরিদপুরের মধুখালীতে বৃদ্ধা মাতা চাপারাণীকে হত্যা করে মাদক ব্যবসায়ীর বখাটে ছেলে দেবাশীষ সাহা একই পদ্ধতিতে। কারণ, মেয়ের ইভটিজিংকারীর বিরুদ্ধে তিনি প্রতিবাদ করেছিলেন মা হয়ে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় শিক্ষা মন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ এম.পি. ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ইভটিজিং প্রতিরোধ কমিটি গঠনের কথাও জানান। এ উদ্যোগ নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী।

মধুখালীর বসবাহিনী নামক বখাটে দল যাদের কাজই বখাটেপনা, চাদাবাজী ও ছিনতাই ইত্যাদি। এমন এক দলের সদস্য বখাটে সন্ত্রাসী সোহেল মোল্লা বিগত ০২-০৯-২০১০ ইং তারিখে অপহরণ করে অজিত কর্মকারের বিবাহিত কন্যা রতœাকে। আইন শৃংঙ্খলা বাহিনীর প্রতি জন-সাধারণ কতটা নির্ভরশীল হতে পারে? এ প্রশ্ন সবারই। এক্ষেত্রে পত্রপত্রিকার ভাষ্য মতে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতার প্রতিও অবহেলিত মানুষের মনে অবহেলার অভিযোগ থাকাটাই স্বাভাবিক। প্রতিবাদ করায় কুমিল্লায় এক শিক্ষকের পা ভেঙ্গে দিয়েছে বখাটেরা। অন্যদিকে, মেয়ের বাবা-মাকে আহত করেছে এক ইভটিজার। বিয়ের প্রস্তাবে রাজী না হওয়ায় এক ছাত্রীর হাত-পা ভেঙ্গে দিয়েছে এক বখাটে। ইতিমধ্যেই কয়েক ডজন অভিভাবককে আহত করেছে বখাটেরা। কারণ হিসেবে বলা যায়, বখাটেরা নিঃসন্দেহে অনৈতিকতায় আকন্ঠ নিমিজ্জিত। এরা সমাজের কলঙ্ক। সমাজ ও দেশের উন্নয়নে বাধার কারণ। বিশ্বস্ত সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী চলতি বছরের ১২ ডিসেম্বর/২০১০ ইং পর্যন্ত প্রতিবাদ করতে যেয়ে ১৯জন নিহত হয়েছেন। এবং অপবাদ সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করেছেন ৩১জন।

ছেলেদের চেয়ে মেয়েরা দুর্বল চিত্তের ও অভিমানী। এদের অনেকেরই আতœসম্মান বোধ কাজ করে, যার ফলে অনেক ছোট অপমানে জীবনকে ত্চ্ছু ভেবে আতœহত্যা করে। মেয়েদেরও প্রতিবাদী হতে হবে। ইভটিজিং শুধু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যেই হয় এমন নয়। অফিস, শিল্পকারখানা, পরিবহন, সিনেমা হল, দোকানপাঠ এবং পার্কেও ঘটে। বখাটে এবং বেকার যুবকদের মধ্যেই এর প্রবণতা বেশী। অন্যদিকে উভয়ের মধ্যে মনের ভাব, বিয়ের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ বা বিয়ের প্রস্তাবে নারাজী থাকা ইত্যাদিও ইভটিজিং এর কারণ হতে পারে।

বর্তমানে ভ্রাম্মামান আদালত বিশেষভাবে তৎপর, দেশের বিভিন্ন স্থানে বেশ কয়েক ডজন ইভটিজারদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদন্ড ও অর্থদন্ডে দন্ডিত করা হয়েছে। আশা করা যায়, আইনের সঠিক বাস্তবায়নই একমাত্র ভরসা এ ধরনের ক্যানসার হতে জাতিকে রক্ষা করা। আইনের মূল উদ্দেশ্যই হচ্ছে সমাজ বা দেশের জনগণকে একটি সুষ্ঠু ও সুন্দর ভাবে পরিচালিত করা। সুতরাং, দেখা যাচ্ছে, ইভটিজার হল এক শ্রেণীর বখাটে। এদের অনেকে রাজনৈতিক দলের নাম ভাঙ্গিয়ে সমাজের সাধারণ মানুষকে ভয়-ভীতির মাধ্যমে ইভটিজিং এর চেয়েও জঘন্য অপোরাধ করে। প্রকৃত অর্থে এরা দেশ ও দলের শত্রু। চরিত্র গঠনের প্রথম ধাপই হল শিশুকাল। উন্নয়নে ব্যাঘাৎ ঘটাতে এবং যুদ্ধাপরাধীর বিচারকে বাধাগ্রস্থ্য করতে কিছু অপশক্তির ই›দ্ধন আছে কিনা তাও ভাববার বিষয়। কয়েকদিন পূর্বে অ্যানথ্রাক্স আতঙ্কের মাধ্যমে পোল্ট্রি সিন্ডিকেট তৈরী করে প্রাণিসম্পদে ধস নামানোর উদহরণও রয়েছে এ দেশে। ইভটিজিং ভিন্নধর্মী হলেও দেশের উন্নয়নে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বাধাগ্রস্থ করছে কোন কোন মহল। প্রতিরোধে দিনদিন জনগণ শক্তি সঞ্চার করছে। যেমন ২৫-১০-২০১০ ইং বগুড়ার ধনুট উপজেলা, মর্জিনা খাতুন সাহসের সাথে এক লম্পট ইভটিজারকে বটিহাতে প্রতিহত করেন। ফলে তাকে পুরস্কৃত করা হয়। এমনিভাবে জনগনই একদিন এদের উৎখাত করবে সমাজ থেকে। অনেক পিতা ইতিমধ্যেই তার ইভটিজার সন্তানকে থানায় সৌপর্দও করছেন। এরাই সত্যিকার অর্থে অভিভাবক, তাদের আন্তরিকতার সাথে অভিনন্দন জানাই।

ইভটিজিং এর মূল উৎস্য যেমন,
সন্তাানের ব্যাপারে পিতামাতাও, অভিভাবকের উদাসীনতা এবং খারাপ সহপাঠীদের সাথে সঙ্গ দেওয়া। ছোটবেলা হতেই পারিবারিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ও নৈতিক শিক্ষা হতে বঞ্চিত হওয়া। মাদকাসক্ত বা মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত পরিবারের সন্তান। যত্রতত্র অশ্লীল চলচিত্র প্রদর্শন, টিভিতে আপত্তিকর অনুষ্ঠান প্রচার এবং এর সিডির সহজ লভ্যতা। মোবাইল ফোনের অপব্যবহার। অশ্লীল সাইবার সন্ত্রাস, ইত্যাদি ইভটিজিং এর মূল উৎস। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে নায়িকা বা নর্তকীদের আপত্তিকর পোষাক পরিধান করা।

ইভটিজিং হতে প্রতিকারের উপায়ঃ
অপরাধের শাস্তির মেয়াদ বৃদ্ধি, অপরাধী ধরা ছোয়ার বাইরে থাকলে মালামাল ক্রোকের বিধান রাখা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিশেষ স্থান গুলোতে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারী বৃদ্ধি করা। দলমত নির্বিশেষে সকল শ্রেণী ও পেশার সবাইকে যে কোন অপরাধের বিরুদ্ধে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সর্বতভাবে সহযোগীতা করা । ইভটিজিং নামক ক্যান্সার হতে সমাজ তথা জাতিকে কলুস মুক্ত রাখতে হলে প্রথমেই পারিবারিক, প্রতিষ্ঠানিক ও ধর্মীয় শিক্ষা প্রদান প্রত্যোকটি পিতামাতার প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব মনে করা। প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র-ছাত্রীদের নৈতিক শিক্ষা দান করা।

সবাই এই প্রতিজ্ঞা করি, এ ধরণের গর্হিত কাজ করে কলঙ্কের ঘানি আজীবন নিজেও টানবো না, মাতা-পিতা ও আত্মীয়-স্বজনকে গ্লানিতে ফেলব না। মনে রাখতে হবে আজ যে ব্যাক্তি অন্যের মেয়েকে ইভটিজিং করছে ভবিষ্যতে তার মেয়েও এ থেকে পরিত্রাণ পাবে না এটাই স্বাভাবিক। যেহেতু এটা সামাজিক বেধি ক্যান্সার সমতূল্য। ইভটিজিং করে বখাটে ও লম্পট হিসেবে নিজেকে সমাজে আত্মপ্রকাশ করানো যায়। কিন্তু জোর করে ভাল মানুষ সেজে ভালবাসা আদায় করা যায় না। একটি কথা মনে রাখতে হবে, আমরা সবাই এদেশের নাগরিক এবং ৩০ লক্ষ শহীদের আত্মত্যাগে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের স্বতস্ফূর্ত অংগ্রহণের মধ্য দিয়ে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ বিশ্বের মানচিত্রে স্থান দখল করে নেয়। বিশ্বের দরবারে দেশের মানমর্যাদা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে আমাদের সবাইকে দলমত নির্বিশেষে এক যোগে কাজ করতে হবে। এটাই হবে সবার জন্য মহান কাজ। এর ব্যাতিক্রম হলে আমরা সবাই, নিজের এবং ভবিষ্যত প্রজন্মের ধংসের জন্যই যথেষ্ট। হত্যার পরিবর্তে হত্যার বিধান রয়েছে। বিশৃংখলা সৃষ্টি করা হত্যা অপেক্ষা জঘন্যতম অপরাধ (আল-কোরান, সুরা আল-বাকারাহ্ আয়াত নং-১৭৮ ও ২১৭)।

প্রকাশিতঃ দৈনিক করতোয়া, ২৮ জানুয়ারী/২০১১ ইং, পৃষ্ঠ- ৪

eve teasing

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares