কেন ঘটছে কল-কারখানায় অগ্নিকান্ড: অধ্যাপক ডাঃ ফজলুল হক

অগ্নিকান্ড বা অগ্নিসংযোগের ঘটনা আদিকাল থেকেই ঘটে আসছে। এর প্রেক্ষিতে ২০১৩ সালে অগ্নিকান্ডের কারণ ও প্রতিকার নিয়ে একটি লিখা লিখি ।সেটি দৈনিক কালেরকন্ঠের উপসম্পাদকীয় পাতায় প্রকাশিত হয় ।লিখাটি ছিল, কুপী, মাটির চুল্লী, মোমবাতী, মশার কয়েল, ছাইয়ের স্তুপ বা বিড়ি-সিগারেটের আগুন থেকেই ছন ও বাঁশের কুড়ে ঘর বা টিনের ঘরে আগুন ধরে থাকে। মুহুর্তেই নিঃশেষ হয়ে যায় ঘরে সংরক্ষিত ধান, চাল, পিয়াজ, রসুন থেকে শুরু করে গরু ছাগলসহ সব কিছু। আগুন নেভানোর জন্য ব্যবহার হতো পুকুর, নদী, খাল ও বিলের পানি।

আন্তরিকতার সঙ্গে আগুন নেভাতে ঝাঁপিয়ে পড়ত এলাকাবাসী। যথাসম্ভব চেষ্টা করত জানমাল রক্ষায়। এলাকাবাসী নিঃস্ব ব্যক্তিকে সাহায্য করত বাঁশ, ছন বা টিন, কাপড় ও রান্না করা খাবার দিয়ে। এমনকি ধান পাটের বীজ দিয়ে সাহায্য করা হত প্রয়োজনের সময়। অর্থাৎ মানুষের মধ্যে যত ধরনের আন্তরিকতা থাকা দরকার তার কোন অভাব ছিল না সেই অতীত যুগে। বর্তমানে গ্রাম-গঞ্জে অগ্নিকান্ড ও অগ্নিসংযোগ হ্রাস পাওয়ার কারন হচ্ছে ঘরবাড়ি সবকিছুই এখন পাকা, আধাপাকা এবং টিনের। এছাড়া মানুষও সচেতন। বর্তমানে আগুন লাগার কারণ বা উৎস্য ভিন্নতর। গ্যাস চুলী ও বিদ্যুৎ লাইনে সর্টসার্কিটই প্রধান। গ্যাসের চুল্লী জ্বালিয়ে রাখা, ভুলক্রমে নিভানো চ্ল্লুীর সুইচ চালু রাখা, গ্যাসসিলিন্ডার ও গ্যাস লাইন বিস্ফোরন ইত্যাদি। সবচেয়ে বিপদজনক কারণের অন্যতম হল বিদ্যুৎ লাইন থেকে অগ্নিকান্ড। যখন সর্টসার্কিট হয় তখন দু’টি পজেটিভ ও নিগেটিভ তার একত্র হয়। এ যাবৎ যত বড় ধরনের ঘটনা ঘটছে তা হল বিদ্যুৎ লাইনের সটসার্কিট থেকে অগ্নিকান্ড।

বিগত কয়েক বছরে অগ্নিকান্ড ও অগ্নিসংযোগের কারণে জান ও মালের অপূরনীয় ক্ষতি সাধিত হয়েছে। যেমন-২০১১ সালে বসুন্ধরা সিটিতে অগ্নিকান্ড, ২০১২ সালে ষ্টিল মিল কর্পোরেশন অফিসে অগ্নিকান্ড, তাজরিন গার্মেন্টেসে অগ্নিকান্ডে (১২০ জনের প্রাণহানি ও কয়েক শত আহত), মিরপুর ১নং সেকশনের গার্মেন্টেসে অগ্নিকান্ডে (মালিকের মৃত্যু), মোহাম্মদপুরে স্মার্ট এক্সপোর্ট ফ্যাক্টরীতে অগ্নিকান্ডে (৭ শ্রমিকের মৃত্যু), রাজধানীর তল্লাবাগে অগ্নিকান্ডে (নিউ মডেল স্কুলের ছাত্রের মৃত্যু), নর্থ সাউথ ইউনিভারসিটিতে অগ্নিকান্ড, আগারগাও বস্তিতে (কয়েকটি শিশুর মৃত্যু) অগ্নিকান্ড ইত্যাদি। প্রাণনাশের পাশাপাশি আহত হয়েছে বেশ কয়েকশ। সম্পদের ক্ষতির পরিমান শতশত কোটি টাকা।

এছাড়া বিশ্বের অনেক দেশে আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত, গভীর বনে দাবানল ইত্যাদি। অগ্নিকান্ডের মুল কারন হচ্ছে, অদক্ষ ইলেকট্রিশিয়ান দ্বারা বাসা বাড়ী ও ইন্ড্রাস্ট্রিতে বিদ্যুৎ লাইন বসানো; তারের বাহিরের আবরণ ওহংঁষধঃবফ রিৎব এর ক্ষেত্রে দুর্বল হওয়া; তারের ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত লোড ব্যবহার করা; বিদ্যুৎ ঈড়হহবপঃরড়হ এর প্রয়োজনীয় সকেট, সুইচ ইত্যাদিতে সমস্যা; বেআইনীভাবে চোরাই লাইন ব্যবহার করা; হিটার ব্যবহার যা তারের ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত বিদ্যুৎ সরবরাহের কারণে অগ্নিকান্ড হতে পারে। তাছাড়াও রয়েছে পিপিলিকা, তেলাপোকা, ইদুর, টিকটিকিসহ বিভিন্ন প্রাণির কর্মকান্ড। এক্ষেত্রে আমার বাস্তব অভিজ্ঞতা হলো পিপিলিকা তারের বহিরাবরন অর্থাৎ তারের প্লাষ্টিক ত্বক বা আবরন এমনভাবে খায় যে, তারকে উন্মুক্ত করে ফেলে। এক্ষেত্রে পজেটিভ ও নিগেটিভ তারদ্বয় একত্র হয়ে বাসাবাড়িতে আগুন লাগার একটি বড় কারণ বলে মনে হয়। সর্টসার্কিট হলে প্রথমেই তারের প্লাষ্টিক আবরনটিতে আগুন ধরে। জ্বলন্ত আগুনসহ নিচে ঝরে পড়তে থাকে ফলে ঐ স্থানে রাখা জিনিস পত্রে আগুন লেগে সমগ্র ঘরে ছড়িয়ে পড়ে লেলিহান শিখায়। এভাবেই বিদ্যুৎ থেকে অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটে। এক্ষেত্রে গার্মেন্ট ফ্যাক্টরী, পাটকল ও সুতার মিলগুলো বেশী ঝুঁকিপূর্ণ।

এখন আমাদের করণীয় কি? বিগত ৫০-৬০ বছরের বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে বলছি, অগ্নিসংযোগ বা অগ্নিকান্ডের কারণ যাই হোক না কেন সম্ভব হলে সঙ্গে সঙ্গে পানি বালু বা ভিজা কম্বল দ্বারা আগুন নিভানোর চেষ্টা করা। সম্ভব না হলে তাড়াতাড়ি ঘর হতে বের হয়ে পড়–ন। সাথে সাথে ফায়ার সার্ভিস অফিসে খবর দিন। এ ধরনের ঘটনা যাতে ভবিষ্যতে না ঘটে সে জন্য কয়েকটি বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন, যেমন-বাসাবাড়িতে ভাল ব্রান্ডেড তার ব্যবহার করতে হবে; অভিজ্ঞ ইলেকট্রিশিয়ান দ্বারা বিদ্যুৎ লাইনের কাজ করাতে হবে; কাজের তদারকীর দায়িত্ব থাকবে ইলেকট্রিক ইঞ্জিনিয়ারদের উপর; গ্রীডলাইন থেকে সার্ভিস তারটি হতে হবে যাথাযথ ও মানসম্পন্ন যা প্রকৌশলীদের দ্বারা পরীক্ষিত। বাসা ও মিল কারখানার পিপিলিকা, তেলাপোকা, ইদুর এমনকি সাপ থেকে মুক্ত রাখুন। সাপ ট্রান্সফর্মারের বড় সক্রু। সাপের কারণে হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি ট্রান্সফরমার এরিমধ্যে সর্টসার্কিটের মাধ্যমে বিকল হয়েছে। বাসা, মিল কল-কারখানা ও ছাত্রাবাসে হিটার ব্যবহার থেকে বিরত থাকা প্রয়োজন। বাসা বাড়ীর বিদ্যুৎ বক্সে ছোট খাট পয়েন্ট বরাবর নীচে আসবাপত্র, কাপড় চোপড় বা দাহ্য পদার্থ রাখা নিরাপদ নয়। ফায়ার সার্ভিস, বিদ্যুৎ, গ্যাসসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা সংস্থার একাধিক মোবাইল বা টেলিফোন নম্বর ঘরের দরজায় লটকিয়ে রাখুন। বাসাবাড়ীতে প্রবেশ পথটি এমন হতে হবে যাতে ফায়ার সার্ভিস ও এ্যাম্বুলেন্স প্রবেশ করতে পারে; প্রতিটি বাসাবাড়িতে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র (ফায়ার স্টিংগুইশার) ঝুলিয়ে রাখা একান্ত প্রয়োজন।

এ বিষয়ে পরিবারের সব সদস্যদের ব্যবহার বিধি জানিয়ে বা শিখিয়ে দেওয়া। বাসা ত্যাগ করার পূর্বে ফ্যান, লাইটসহ সবকিছু বন্ধ রাখা। গ্যাস চুল্লীর সুইস বন্ধ রাখার বিষয়টি অত্যন্ত জরুরী। অধিক সময়ের জন্য বাসাবাড়ি ত্যাগ করলে মেইন সুইচ অফ রাখা নিরাপদ। বাসার মধ্যে কাউকে রেখে তালা বন্ধ করা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। যা বিগত কয়েকদিন আগে ঘটে গেল। সর্বপরি প্রবেশ বহিরাগমন পথ প্রয়োজন অনুযায়ী প্রশস্ত হওয়া বাঞ্চনীয়। মাল্টিষ্টোরিড সু-উচ্চ ভবনের ছাদে হেলিপ্যাডের ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন। অগ্নিসংযোগ একটি দুর্ঘটনা যা যেকোন সময়, যেকোন স্থানে, যেকোন ব্যাক্তির জীবনেই আসতে পারে। ঠান্ডা মাথায় বিষয়টি মোকাবেলা করতে হবে। সমাধানে সবাইকে সহযোগিতা করতে হবে। ক্ষতির পরিমান বছরে কোটি কোটি টাকা, মানুষও গৃহ পালিত প্রাণির জীবনও অকালে ঝরে যায়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ একাজের সাথে জড়িত ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান এবং বাসাবাড়িতে বসবাসকারী সবাইকে অগ্নিসংযোগের বিভিন্ন কারন, আত্মরক্ষার কৌশল বিষয়ে প্রশিক্ষণ ও সচেতনতার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। সচেতনতা হতে পারে একটি ছোট উদ্যোগ যা বড় একটি দুর্ঘটনার হাত থেকে রক্ষা পেতে পারে সম্পদ ও মূল্যবান জীবন।

দৈনিক কালের কন্ঠ (উপ-সম্পাদকীয়, পৃঃ ১৪) ২৪/০৭/২০১৩

https://drive.google.com/open?id=1WhUFyvGkFYIQeLiea1VQOUropEyWWKwX

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *