রামপাল ইস্যু এবং আশার আলো

বর্তমানে দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়ায় কয়লা ভিত্তিক ২৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি সুস্থ পরিবেশ বজায় রেখেই চালু রয়েছে। সুতরাং সুন্দর বন হতে ১৪ কিলোমিটার দুরে রামপালে নির্মানাধীন কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি স্থাপিত হলে ১৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হবে। বড় পুকুরিয়ার সাথে তুলনা করলে পরিবেশের জন্য তেমন একটা ক্ষতির আশঙ্কা আছে বলে মনে হয় না। তার পরও সতর্কতা অবলম্বন করা মঙ্গলজনক। বিশ্বের অনেক দেশেই কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র রয়েছে। পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র ভারতেও রয়েছে। আমেরিকায় প্রায় ৩০০ টি কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র রয়েছে। ২০১০ সালে ১৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় সুন্দরবন থেকে ১৪ কিলোমিটার দুরে রামপালে ১৮৩৪ একর জমি অধিগ্রহন ও মাটি ভরাটের কাজ চলে। রামপাল সমূদ্র বন্দরের কাছাকাছি হওয়ায় কয়লা আমদানীতে এ পথ সহজ এবং খরচও তুলনামূলক কম। সুতরাং বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় হ্রাস পাবে নিঃসন্দেহে।

২০১৩ সালের ২০ এপ্রিল বাংলাদেশ সরকার পিডিবি এবং এনটিপিসি প্রকল্প বাস্তবায়ন সংক্রান্ত চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। বিশ্বস্থ সূত্রে জানা যায় ২০১৩ সালে ২০ জানুয়ারী ঈবহঃবৎ ভড়ৎ ঊহারৎড়হসবহঃ ধহফ এবড়মৎধঢ়যরপধষ ওহভড়ৎসধঃরড়হ ঝবৎারপবং (ঈঊএওঝ) কে রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পের পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা বা যাচাবাছাই পূর্বক ১০ই জুলাই পিডিবি পরিবেশ অধিদপ্তরে জমা দেয়। বাগেরহাটের রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপিত হলে পরিবেশের জন্য সমস্যা হওয়ার কথা নয়। বিশ্বে যতধরনের ইন্ডাষ্ট্রি রয়েছে প্রায় সবগুলো থেকেই কার্বনডাই-অক্সাইড সহ বিভিন্ন ধরণের গ্যাস নির্গত হয়ে বৈশ্বিক জলবায়ুর ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে, তাই বলে কি ইন্ডাষ্ট্রিগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বা বন্ধ করে দেওয়া কোন দেশের জন্যই অর্থবহ হবে না।

রামপালের বিষয়টিকেও একই বিবেচনায় ভাবতে হবে। সব ক্ষেত্রে বিশ্লেষণ করে দেখা যায় রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি বিদ্যুৎ উৎপাদন তথা দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নের মানদন্ডে অতীব প্রয়োজন। উল্লেখ্য, একমাত্র ঢাকা ও নারয়নগঞ্জের চারপাশেই রয়েছে প্রায় দুই হাজার কয়লা ও গ্যাস ভিত্তিক ইটভাটা। প্রায় ১০০ একর জমির উপর ঢাকার মিরপুর বোটানিক্যাল গার্ডেন, চিড়িয়াখানা ও কেন্দ্রীয় হাঁস-মুরগীর খামার স্থাপিত। এ এলাকা থেকে মাত্র ২ কিলোমিটার বা তার চেয়েও কম দূরত্বে বেশ কয়েকটি কয়লা ভিত্তিক ইট ভাটা রয়েছে।

সেখানে উল্লেখযোগ্য ক্ষতির বিষয়ে তেমন কোন আলোচনা বা সমালোচনা হচ্ছে না। এ এলাকায় গাছপালা, লতাপাতা ও শাকসবজি উৎপাদিত হচ্ছে যথারীতি। এ দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায় সুন্দরবন অঞ্চল থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত রামপাল কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির অবস্থান সুন্দরবনের জন্য কোন ক্ষতির কারন হবে না। অন্যদিকে এ বিদ্যুৎ কেন্দ্র পরিবেশের দিকে নজর রেখেই করার ব্যাপারে কর্তৃপক্ষ বিন্দুমাত্রও অবহেলা করবে না-এ বিশ্বাস টুকু না থাকলে দেশে উন্নয়নের ছোঁয়াই বা লাগবে কিভাবে? ভারতের নবায়নযোগ্য জ্বালানী মন্ত্রী ফারুক আব্দুল্লাহ দৃঢ়তার সাথেই বলেছেন রামপালে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতেই কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র হতে যাচ্ছে।

সুন্দর বনের জন্য কোন ক্ষতির কারণ হবে না। কারন বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রটি পরিবেশ বান্ধব কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। একটি উদাহরন দিয়ে উল্লেখ করা যায়, বাংলাদেশে প্রায় ১০ হাজারের বেশী ইটভাটা রয়েছে যেখানে কয়লা, কাঠ, গ্যাস ও ফার্নেস ওয়েল ব্যবহার করা হয়ে থাকে। গত আশির দশকে ইটভাটার ধোয়া নির্গমন চিমনিগুলোর উচ্চতা ছিল মাত্র ৩০-৪০ ফুট। ফলে পার্শবর্তী ক্ষেতের ফসলের ক্ষতিসহ পরিবেশের উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ত। বর্তমানে ওই চিমনির উচ্চতা হচ্ছে ১২০ হতে ১৩০ ফুট। ফলে এখন আর সে ধরনের ক্ষতি হচ্ছে না।

তেমনি নতুন প্রযুক্তিতে কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র হতে উৎগীর্ণ ধোয়া বা ছাইও ১৪ কিলোমিটার দুরেত্ব অবস্থিত সুন্দর বনের গাছ পালার কোন ক্ষতি করতে পারবে না বলেই প্রতিয়মান হচ্ছে। এ বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হলে ওই এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে বড় বড় কলকারখানা স্থাপন করা সম্ভব হবে। ফলে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে খুলনা ও বরিশালসহ দক্ষিণাঞ্চরের মানুষের। ভবিষ্যতে সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। নেপাল, ভূটান থেকে বিদ্যুৎ বাংলাদেশে আমদানিতে ভারতের ভূখন্ড ব্যবহার ছাড়া সম্ভব নয়। তা ছাড়া পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রের সঙ্গে সব ক্ষেত্রেই সুসম্পর্ক স্থাপন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশ ও জনগনের স্বার্থেই বর্তমান সরকার সীমাহীন চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ভাগ্যে জুটছে বাধা আর বাধা। রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের ক্ষেত্রে সব ধরনের আনুষ্ঠানিকতা যথাযথভাবে শেষ করেই সরকার এ প্রকল্পের মূল অবকাঠামো তৈরীতে হাত দিয়েছে। অর্থাৎ সুন্দর বনের পরিবেশ ও স্থানীয় জনগনের মঙ্গলের দিকটি বিবেচনায় এনেই বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রটি স্থাপন করা হচ্ছে। এটি একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ।

এক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে রুপপুরে একটি নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লাট স্থাপনের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপনের মাধ্যমে উদ্ভোধন করা হয়েছে। বর্তমানে ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়েছে। আগামী ডিসেম্বরে আরও ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। এ ব্যাপারে সব শ্রেনীর মানুষ আনন্দিত। জনগন সরকারের এ উন্নয়নমূলক পদক্ষেপের জন্য সাধুবাদ জানিয়েছে। পরিবেশ রক্ষায় গাছপালা, বন জঙ্গল ও প্রাণিকুলের প্রয়োজনকে গুরুত্বসহকারে অনুধাবন করতে হবে। তবে জনহিতকর উন্নয়নমূলক কোন সরকারী কাজে বাধা দিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলকে জনগন কোন ভাবেই মেনেনিতে পারে না বা কারও জন্য সুখকর নয়। এটিই বাস্তব সত্য। তবে সুন্দরবন ও বনের মধ্যে সব শ্রেনীর প্রাণিকূল যেন স্বাচ্ছন্ধে জীবনযাপন করতে পারে সে দিকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই নজর রাখতে হবে। প্রয়োজনে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার নিশ্চিত করতে আরও পদক্ষেপ গ্রহন করতে হবে।

https://www.kalerkantho.com/print-edition/sub-editorial/2013/11/30/25952                                                                                                 rampal issu

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Wordpress Social Share Plugin powered by Ultimatelysocial