মহাসেন ও জলবায়ু পরিবর্তন

যেকোন উপায়ে বাতাসে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমান অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধির কারণে বৈশ্বিক জলবায়ুর পরিবর্তন ঘটে, যা মানুষসহ সব প্রাণী এমনকি উদ্ভিদের জন্যও অমঙ্গল বয়ে আনতে পারে। ১৮৯৬ সালে প্রথম তথ্যানুসন্ধান করেন সুইডিশ রসায়নবিদ আরহেনিয়াস এবং তিনি উল্লেখ করেন জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো, বৃক্ষ নিধন, জঙ্গল সাফ করা, কৃষিকাজসহ বিভিন্ন কারণে বাতাসে কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমান বাড়ে।

যানবাহন, কল-কারখানা, ইটভাটা ও গ্রীনহাউস থেকে নিঃসৃত ক্লোরোফ্লোরো কার্বন (সিএফসি) গ্যাস, যা প্রাণীদেহের জন্য ক্ষতিকারক। বায়ুমন্ডলে ক্রমবর্ধিষ্ণু গ্রীনহাউজ গ্যাসের উদগিরণের প্রভাবেই জলবায়ুর পরিবর্তন ঘটে। ফলে উষ্ণতা বৃদ্ধির পাশাপাশি সাইক্লোন, জলোচ্ছাস সহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দেয়। বিভিন্ন তথ্যে জানা যায়, বর্তমানে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনে ঝুঁকির তালিকায় শীর্ষে রয়েছে এবং প্রতি বছর জলবায়ুর নেতিবাচক প্রভাবে সৃষ্ট প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বাংলাদেশে প্রায় ১০ হাজার মানুষ মারা যায়। বিশ্ব জনসংখ্যার ৫ শতাংশ মানুষ আমেরিকায় বাস করে আর বাতাসে কার্বন ডাই-অক্সাইড ছড়ায় ২৩ শতাংশ। অন্যদিকে ১৭ শতাংশ মানুষের দেশ ভারত ছড়ায় মাত্র ৪ শতাংশ কার্বন ডাই-অক্সাইড। উল্লেখ্য, উন্নত দেশগুলোতে শিল্প বিপ্লবের কারণে অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যবহারের ফলে বায়ুমন্ডলে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের মাত্রা বেড়ে যাচ্ছে।

চীনের ডাচেস ব্যাংক পরিচালিত জরিপের ভাষ্যমতে, কল-কারখানা ও যানবাহন থেকে নিঃসৃত ধোয়ার পরিমান অপরিবর্তিত থাকলে ২০২৫ সাল নাগাদ দূষণের মাত্রা আরও ৭০ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। চীনের রাজধানী ও বড় শহরগুলোতে বর্তমানে বায়ু দূষণের মাত্রা মানুষের জন্য সহনীয় মাত্রার ৪০ গুন বেশী। ফলে অধিকাংশ শিশুরা শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত হচ্ছে। বিষাক্ত বাতাসের কারণে অনেকেই চীন ছেড়ে অন্যত্র চলে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে (সূত্র:নিউ ইয়র্ক টাইমস)।

জাতিসংঘের উদ্যেগে বৈশ্বিক উষ্ণতা ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে করনীয় নির্ধাণের লক্ষ্যে মেক্সিকোর কানকুনে ২০১০ সালের ২৯ নভেম্বর থেকে ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৬তম বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এ সম্মেলনে যে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় তা হচ্ছে “কিয়োটো প্রটোকলে একটি নতুন নিয়ম চালু করা হয়, যাতে শিল্পের অগ্রগতি ঠিক রেখে কার্বন ডাই-অক্সাইডের মত গ্রীন হাউজ গ্যাস কম নির্গত করানো। কার্বন ডাই-অক্সাইডসহ নাইট্রাস অক্সাইড, সালফার হাইড্রোফ্লুরোকার্বন, হেক্সাফ্লোরাইড, কপার ফ্লুরোকার্বন স্যালিকেও গ্রীনহাউজ গ্যাস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এগুলো নিয়ন্ত্রনে রাখার জন্য বাজার ভিত্তিক ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে ওই সম্মেলনে; যাকে ‘কার্বন ট্রেডিং’ বলা হয়। উল্লেখ্য, ২০০৬ সালে প্রতিটন কার্বন সঞ্চয়ের মূল্য ছিল ৫ থেকে ১৬ মার্কিন ডলার। বিশ্বের সব উন্নয়নশীল দেশে এ প্রকল্প চালু থাকলে ভবিষ্যতে কার্বন ডাই-অক্সাইডের মতো উষ্ণতাবর্ধক গ্যাস নির্গত হলেও সহনীয় মাত্রায় রাখা সম্ভব হবে। ফলে বিশ্বের সব জীববৈচিত্র যথারিতি বেঁচে থাকতে সহায়ক হবে। প্রকৃত অর্থে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সম্মিলিত জাতিপুঞ্জে যুদ্ধের বিরুদ্ধে ও শান্তির পক্ষে এবং পরিবেশ দূষণের বিরুদ্ধে একাধিক সন্মেলন করেছে। ভালো ভালো সিদ্ধান্ত নিয়েছে; কিন্তু বাস্তবে তা অনুসরণ করা হয়নি।

উল্লেখ্য, অধ্যাপক মোঃ আখতার হোসেন (সাবেক উপাচার্য, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়) ২০১০ সালের ২৮ নভেম্বর একটি দৈনিক প্রকাশিত প্রবন্ধে উল্লেখ করেন, বিশ্বের বর্তমান জনসংখ্যা ৭০০ কোটির অধিক; যা ২০৫০ সালে বেড়ে ৯০০ কোটি ছাড়িয়ে যাবে। ওই সময় বর্ধিত জনগোষ্ঠীর জন্য প্রাণিজ আমিষের চাহিদা বর্তমানেন চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ হবে। এ অতিরিক্ত চাহিদার প্রেক্ষাপটে প্রাণীপালন বৃদ্ধি পাবে। এসব প্রাণির শ্বাস-প্রশ্বাস, পরিপাকতন্ত্র এবং বর্জ্য থেকে উদগিরিত গ্যাসও জলবায়ু পরিবর্তনে ভূমিকা রাখবে।

এছাড়া আগামী শতাব্দীতে বিপুল জনগোষ্ঠার জন্য নির্মল অক্সিজেন জোগান দেওয়ার ক্ষেত্রে ভারাক্রান্ত এ পরিবেশ কতটুকু অনুকূল থাকবে তা নিয়েও বিজ্ঞানীদের মধ্যে উৎকন্ঠা রয়েছে। নাসার জলবায়ুবিদরা বলেছেন, শতাব্দীর মধ্যে উষ্ণতম বছর ছিল ২০০৫। এরপর ছিল ১৯৯৮, ২০০২, ২০০৩ ও ২০০৪ বছরগুলোর তাপমাত্রা। পৃথিবীর বায়ুমন্ডলে গড় ঘনত্ব ১৯৯০ সালে ছিল ৩৫৩ পিপিএমভি এবং প্রতিবছর তা বেড়ে ১.৮ পিপিএমভি হারে বাড়ছে। এ সমীক্ষা থেকে দেখা গেছে ১০০০ সাল থেকে ১৮০০ সাল পর্যন্ত গড় কার্বন ডাই-অক্সাইডের ঘনত্ব ছিল মাত্র ২৮০ পিপিএমভি। নব্বইয়ের দশকে প্রাকৃতিক বিপর্যয়জনিত মৃত্যুর ৯০ শতাংশের জন্য দায়ী ছিল। বাকি ১০ শতাংশ মৃত্যুর জন্য দায়ী ছিল আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত ও অতিগ্রীষ্ম বা অতিশীতলতা। কিন্তু এই মৃতুগুলোর ৯৭ শতাংশই ঘটেছে গরিব দেশগুলোতে। বিজ্ঞানীদের মতে, বঙ্গোপসাগরের পানির উচ্চতা এক মিটার বৃদ্ধি পেলে বাংলাদশের ১৩.৭৪ শতাংশ আবাদি জমি, ২৮-২৯ শতাংশ বনভূমি সম্পূর্ণরুপে ধ্বংস হয়ে যাবে। ফলে এক কোটি মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়বে। এ ছাড়া বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ হওয়ায় অনাবৃষ্টিও এ দেশের জন্য ব্যাপক সমস্যার সৃষ্টি করছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও গ্রিনহাউস গ্যাসের প্রভাবে দেখা যাচ্ছে প্রাকৃতিক বিপর্যয়। ফলে ভারত ও বাংলাদেশের সমূদ্র সংলগ্ন সুন্দরবন অঞ্চলে ব্যাপক ভাঙন হচ্ছে। মূল সাগরদ্বীপের ৭ হাজার ৫০০ একর জমি অনেক আগেই সাগরের তলায় চলে গেছে। সুন্দরবনের জমিতে আগে ১১ ধরণের ধান চাষ হতো। এখন মাটিতে লবনাক্ততার পরিমান বৃদ্ধির ফলে এসব ধানের চাষ বন্ধ হয়ে গেছে এবং গত ৩০ বছরে এ অঞ্চলে এক হাজার ৬৩৪ বর্গকিলোমিটার জমি সমূদ্র গ্রাস করেছে। সেখানে নতুন চর জেগেছে ৮৬ বর্গকিলোমিটার। বৈশ্বিক উষ্ণায়ণের প্রভাবে গত ২০ বছরে সুন্দরবণ অঞ্চলের সমূদ্রের জলস্তর বছরে গড়ে ৩.১৪ মিলিমিটার করে বাড়ছে, যেখানে সারা বিশ্বের বার্ষিক বৃদ্ধির গড় ২ মিলিমিটার।

বিজ্ঞানীরা মনে করেন, সুন্দরবন অঞ্চলের জলস্তর ১০ সেন্টিমিটার বাড়লে ১৫ শতাংশ ভূমি ডুবে যাবে। ৪৫ সেন্টিমিটার বাড়লে স্থলভাগের ৭৫ শতাংশ ডুবে যাবে এবং সমপরিমাণ ম্যানগ্রোভ অরণ্য ধ্বংস হয়ে যাবে। প্লাবিত অঞ্চলের জল ও মাটিতে লবনের পরিমান বেড়ে যাবে, ফলে ৪২৫ প্রজাতির গাছপালা বিপন্ন হবে। ২৪৬ প্রজাতির বন্য জন্তুর মধ্যে হরিণ, শুকুর, কাছিম ও কুমিরের বংশ লোপ হওয়ার আশাঙ্কা বেশি। সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগার স্থান পরিবর্তন করে জনবহুল এলাকায় মানুষের ক্ষতির পাশাপাশি নিজেদের জীবনও বিপন্ন হবে। আশার কথা, বিশ্বব্যাপী বাঘ সংরক্ষণ তথা বর্তমান সংখ্যা দ্বিগুণ করার কৌশল নির্ধারণের জন্য বাংলাদেশসহ ১৩টি দেশের সরকার প্রধান ও প্রতিনিধিবৃন্দের একটি সম্মেলন সম্প্রতি রাশিয়ায় অনুষ্ঠিত হয়েছে। উল্লেখ্য, সমূদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে কক্সবাজার সমূদ্র সৈকত পানিতে নিমজ্জিত হলে পর্যটন কর্পোরেশনের বছরে শত শত কোটি টাকার লোকসান হবে। তাছাড়া লবণের কারণে কৃষি ও মিঠা পানির মাছ উন্নয়ন বিঘœীত হবে। দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ আশ্রায় ও খাদ্যে অন্বেষণে এরইমধ্যে শহরমূখী হতে বাধ্য হচ্ছে। এর ফলে ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে আইন শৃঙ্খলা পরিনতির অবনতি ও পরিবেশের ভারসম্য ব্যহত হবে।

বিজ্ঞানীদের ধারণা বৈশ্বিক উষ্ণতা ২-৩ ডিগ্রী সেলসিয়েস বৃদ্ধি পেলে ভূ-পৃষ্ঠে ৩৩.৩৩ শতাংশ প্রাণীর প্রজাতি বিপন্ন অথবা বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অতিথি পাখি অতিরিক্ত শীতের প্রভাব থেকে নিজেদের রক্ষার জন্য অপেক্ষাকৃত উষ্ণ অঞ্চলগুলোতে চলে আসায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এসব অতিথি পাখির সংখ্যা আশঙ্কাজনক পর্যায়ে হ্রাস পেয়েছে। মেরু অঞ্চলে তূষারে বাসকৃত প্রাণী, যেমন মেরু-ভল্লুক ও পেঙ্গুইন পাখীর সংখ্যা হ্রাস পাবে। ২০৫০ সালের মধ্যে প্রায় ২২ হাজার মেরু-ভল্লুকের মধ্যে প্রায় সাড়ে ১৪ হাজার অকালে বিলুপ্ত হবে। তেমনি ১৮ প্রজাতির মেরু পেঙ্গুইনের মধ্যে ১১ প্রজাতিই বিপন্ন হতে পারে উষ্ণতা বৃদ্ধি ও মেরু অঞ্চলের বরফ গলার কারণে।
জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য আমরা সবাই কম বেশী দায়ী। কার্বন ডাই-অক্সাইড প্রতিনিয়তই শ্বাস-প্রশ্বাসের সাথে বের হচ্ছে। বিষয়টি যেহেতু সমগ্র বিশ্বের সমস্যা, সেহেতু সমাধানে সবদেশকেই যৌথভাবে এগিয়ে আসতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে অনাবৃষ্টি, তাপপ্রবাহ, ঘূর্ণিঝড়, মরুকরণ, জুনোটিকসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব, অতিরিক্ত পতঙ্গ আক্রমন, খাদ্যাভাবে মানুষসহ প্রাণীকুল অভাবনীয় ক্ষতির সম্মুখীন হবে। জলবায়ুর এ দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক পরিবর্তন অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে জল, স্থল, অরণ্য, অন্তরীক্ষ সর্বত্র মানুষসহ সব পর্যায়ের প্রাণীই আক্রান্ত হবে। বিশ্ব মানবতার কল্যাণে আমাদের এ প্রিয় পৃথিবীকে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব মুক্ত রাখতে ধনী-দরিদ্র সব দেশের সরকার ও জনগোষ্ঠিকে সচেতন হতে হবে। গ্রীনহাউজের মাত্রাতিরিক্ত কার্বন ডাই-অক্সাইড নিয়ন্ত্রনে ধনী দেশগুলোর মুখ্য ভূমিকা পালন করার বিকল্প হতে পারে না।

দৈনিক কালের কন্ঠ (উপ-সম্পাদকীয়, পৃঃ ১৪) ২৩/০৫/২০১৩Mohasen O jolbayu

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *