রেলওয়েতে লোকসান ও আশার আলো

“সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানাকে সচলের মাধ্যমে বছরে প্রায় ১৪২ টি যাত্রীবাহী কোচ ও চার হাজার ৫০০ ওয়াগন তৈরি বা মেরামত করার ব্যবস্থা করা, দেশেই রেলওয়ে ইঞ্জিন তৈরির ব্যবস্থা করা, সর্বোপরি বিদেশ থেকে যন্ত্রাংশ আমদানি হ্রাসের মাধ্যমে অর্থের অপচয় রোধ করা। সব ক্ষেত্রেই সরকারের সদিচ্ছা থাকলেও জনসচেতনতার অভাবে তা বাস্তবায়িত হওয়ার ক্ষেত্রে অন্তরায়। যে কারণে বিভিন্ন সেক্টরে লোকসানের ঘানি টানছে সরকার। পাহাড় পরিমাণ সমস্যা নিয়েই বাংলাদেশের জন্ম। তবে সততা, আন্তরিকতা ও দৃঢ়তার সঙ্গে পরিকল্পিতভঅবে কাজ করলেই সব সমস্যা দূর হতে বাধ্য”

পরিবেশদূষন রোধ ও যানযট নিরসনের প্রধান যোগাযোগ ব্যবস্থাটি হচ্ছে রেলওয়ে। বাস, লঞ্চ, ষ্টিমার কোথাও লাভ ছাড়া কথা নেই। রেলের একটি ইঞ্জিনের ঘাড়ে চড়ে লাখ লাখ যাত্রী যাতায়াত করছে, এর পরও লোকসান হচ্ছে কোটি কোটি টাকা। যেমন- ২০০৫-২০০৬ অর্থ বছরে ব্যয় ৮৮৩ কোটি ১৯ লাখ টাকা, আয় হয় মাত্র ৪৪৪ কোটি ২৭ লাখ টাকা, নিট ক্ষতি বা লোকসান ৪৩৮ কোটি ৯২ লাখ টাকা। ২০০৬-২০০৭ অর্থ বছরে নিট ক্ষতি ৫৬২ কোটি ৯৪ লাখ টাকা এবং ২০০৭-২০০৮ অর্থ বছরে ক্ষতি ৬১৩ কোটি ৬১ লাখ টাকা এবং ২০০৮-২০০৯ অর্থ বছরে লোকসানের পরিমান ৬৩৪ কোটি ১৩ লখ টাকা।

২০০৯-২০১০ অর্থ বছরে লোকসান প্রায় ৬৮১ কোটি টাকা। তাছাড়া প্রতি বছর প্রায় ১১ লাখ টাকা ভর্তুকি দিয়ে যাচ্ছে সরকার। সুতরাং এক্ষতি থেকে পরিত্রান পেতে হবে যে কোন মূল্যেই। বিশ্বের অন্যান্য দেশে রেলওয়ে একটি নিরাপদ ও আরামদায়ক চলাচলের মাধ্যম এবং লাভও হচ্ছে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার। আমরা কি পারবনা এ লাভের অংশীদার হতে?। অবশ্যই পারব। তবে প্রয়োজন সঠিক সিদ্ধান্ত, সততা, আন্তরিকতা ও দেশপ্রেম। এর ব্যত্যয় ঘটলে যা হচ্ছে তাই হবে যুগের পর যুগ ধরে। রেলওয়েতে লোকসান হয়ে আসছে বিগত প্রায় চার যুগ ধরে। তবে বর্তমানে আলো পাওয়া যাচ্ছে কয়েকটি যুগান্তকারী পদক্ষেপের কারণে। তা হচ্ছে ডাবল লেন তৈরির উদ্দ্যোগ, রেল লাইন পূণঃস্থাপন ইত্যাদি।
রেলওয়ে অতীত ও বর্তমানের সমস্ত সমস্যাকে মুছে ফেলবে, দূর হবে দুর্নীতি, লুটপাট, লোকসানের গ্লানী, যাত্রী দুর্ভোগ এবং যানজট। যদি স্বচ্ছতা থাকে চিন্তা-চেতনায়, উপকৃত হবে কোটি কোটি মানুষ, দেশ যাবে আরো এক ধাপ এগিয়ে। এবারই প্রথম রেলওয়ে মন্ত্রণালয়ের জন্ম হল, যা আশার আলোর নির্দেশক বলেই ভাবছেন বিজ্ঞমহল। রেলওয়ে সেক্টরে গতিশীলতা আনতে অনেক ব্যয়ের বোঝা বহন করতে হবে সরকারকে। যে ক্যান্সার প্রবেশ করেছে তা রাতারাতি দূর করা সম্ভব নয়। তবে এটিও ঠিক, স্বচ্ছতা নিয়ে কাজ করলে অনেক কিছুই সম্ভব, যার উদহরণ অনেক ক্ষেত্রেই রয়েছে।

রেলওয়ে শুধু যাত্রীই বহন করেনা, মাদক চোরাচালানীর নির্ভরযোগ্য বাহনও এটি। এদিকে সঠিক নজর পড়লে মাদক পাচারও বন্ধ হবে নিঃসন্দেহে । উল্লেখ্য, স্বচোখে দেখে এলাম রাজবাড়ী থেকে ফরিদপুর হয়ে পুকুরিয়া এবং রাজবাড়ী হতে ভাটিয়াপাড়া পর্যন্ত প্রায় ১০০ কিঃ মিঃ উত্তোলনকৃত রেল লাইনটি পূণঃস্থাপনের কাজ চলছে দ্রুত গতিতে। এ ধারাবাহিকতা চলতে থাকলে দুই বছরের মধ্যে রেলওয়ের সফলতা আসতে বাধ্য । উত্তরবঙ্গে বিশেষকরে পঞ্চগড় থেকে ডাবললেন তৈরীর কাজ দ্রুত গতিতে চলছে, এটি আমাদের জন্য আশার আলোও বটে। তবে এক সরকারের রেখে যাওয়া অসমাপ্ত কাজ নতুন সরকার করতে চায়না-এটাই আমাদের দেশে রেওয়াজে পরিনত হয়েছে।

এ কালচার হতে আামদের বের হতে হবে। ১৮৬২ সালে বৃটিশ শাসনামলে ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে কলকাতা থেকে কুষ্টিয়া পর্যন্ত রেলপথ স্থাপিত হয়। এর ধারাবাহিকতায় বর্তমানে প্রায় ২৮৫৫ কিলোমিটার রেলপথে ৪৮টি মালবাহী এবং ২৩৫টি যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল করছে। দ্রুতগামী ইন্টারসিটি ট্রেনেও যাত্রী দুর্ভোগ কমেনি কারণ সিমাহীন লেট। এর মূলকারণ ডাবল লেন না থাকা, ফলে রাস্তায় সাইড দিতে গিয়ে কোন কোন সময় কয়েক ঘন্টা সময় চলে যায়। লক্ষ করা যায় ট্রেনে বসা তো দুরের কথা, দাঁড়ানোরও একটু জায়গা থাকেনা, তার পরও লোকসানের ঘানি টানতে হচ্ছে কোটি কোটি টাকা।

বিশ্বস্ত সূত্রমতে ১৯৮৬ সালে ২৭টি ইঞ্জিন আমদানী করা হয় কানাডা থেকে এবং ১৯৯৬ সালে ভারত থেকে ১১টি ইঞ্জিন আমদানী করে কোনভাবে চলছে এ গুরুত্বপূর্ণ সেক্টরটি। লোকবলের অভাবে ঠিকমত চেকিং করা সম্ভব নয়, তাই অনেক সময়ে ৩০ টাকার লোকাল ভাড়া ১০/২০ টাকা চেকিং মাষ্টারের পকেটে ঢুকিয়ে চলে যাচ্ছেন অনেক যাত্রী। এ ধরনের ঘটনা আমি নিজেই প্রত্যক্ষ করেছি। এ ধরনের চিত্র কর্মবেশী সমগ্র বাংলাদেশে। উল্লেখ্য, নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন ষ্টেশন মাষ্টার দুঃখ করে বলেন আশির দশকে শক্তিশালী রেলওয়ে বোর্ডটি ভেঙ্গে দুটি অঞ্চল ইস্ট ও ওয়েস্ট নামে বিভক্ত করায় রেলওয়ের পতনের মূলকারণ।

অর্থাৎ ওই সময় থেকেই লোকসনের পাল্লা ভারী হতে থাকে, যার ধারাবাহিকতা অদ্যাবধি। এর আগে সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানা থেকে উন্নতমানের ট্রেনের বগি ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ তৈরি হতো ফলে এ সেক্টরটি থেকে লাভ হতো প্রচুর। উল্লেখ্য, সৈয়দপুরে একটি বগি তৈরিতে যেখানে খরচ মাত্র ৮০ লাখ টাকা, সেই একই বগি বিদেশ থেকে আমদানী করা হয় চার-পাঁচগুন অর্থ ব্যয়ে। ফলে অধিক লোকসান হয়ে আসছে তিন যুগ ধরে। সুতরাং অতীতের অবস্থা থেকে উত্তোরনের জন্য প্রয়োজন-সৎ ও দক্ষ জনবল নিয়োগ দেওয়া, ট্রেনের সংখ্যা বাড়ানো, ষ্টেশনের চতুর্দিকে ফেনসিং এর ব্যবস্থা করা, ডাবল লেন তৈরি করা যা এরিমধ্যে আরম্ভ হয়েছে দেশের বিভিন্ন স্থানে, উন্নতমানের বগি তৈরি এবং বগির সংখ্যা বৃদ্ধি করা, সব সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর পাশাপাশি ভাড়া বৃদ্ধি করণ, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটসহ জনবহুল শহরে মেট্রো ট্রেন ও সাবওয়ের ব্যাবস্থা করা, সমগ্র দেশে মিটার গ্রেজ অথবা ব্রডগেজ যে কোন এক ধরনের ট্রেন চালু থাকা, বেদখলকৃত রেলওয়ের জমি দখলমুক্ত করে লিজ দেওয়ার ব্যবস্থা করা, পর্যটকদের যাতায়াতের সুবিধার্থে কক্সবাজার সমুদ্র সৈয়কত পর্যন্ত রেল যোগাযোগ বৃদ্ধি করা, প্রত্যেক কামরায় সার্কিট ক্যামেরার ব্যবস্থা রাখা, ভ্রাম্যমান আদালতের নজদারি বৃদ্ধি করন, আগের মতো সৈয়দপুর ও চট্টগ্রাম রেলওয়ে কারখানা থেকে চাহিদা মোতাবেক মালবাহী ও যাত্রীবাহী বগি সহ প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ তৈরির মাধ্যমে দেশের কর্মসংস্থান বৃদ্ধির ব্যবস্থা করা।

উল্লেখ্য, আগের মতো সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানাকে সচলের মাধ্যমে বছরে প্রায় ১৪২টি যাত্রীবাহী কোচ ও ৪৫০০ টি ওয়াগন তৈরি বা মেরামত করার ব্যবস্থা করা, দেশেই রেলওয়ে ইঞ্জিন তৈরির ব্যবস্থা করা, সর্বোপরি বিদেশ থেকে যন্ত্রাংশ আমদানি হ্রাসের মাধ্যমে অর্থের অপচয় রোধকরা। সব ক্ষেত্রেই সরকারের সদিচ্ছা থাকলেও জন সচেতনতার অভাবে তা বাস্তবায়িত হওয়ার ক্ষেত্রে অন্তরায়। যে কারণে বিভিন্ন সেক্টরে লোকসানের ঘানি টানছে সরকার। পাহাড় পরিমান সমস্যা নিয়েই বাংলাদেশের জন্ম। তবে সততা, আন্তরিকতা ও দৃঢ়তার সাথে পরিকল্পিতভাবে কাজ করলেই সব সমস্যাই দূর হতে বাধ্য।

প্রকাশিতঃ কালের কন্ঠ (মুক্তধারা), তারিখ ০৪/০৪/২০১২ ইং, পৃষ্ঠা-১৫railway loss

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Wordpress Social Share Plugin powered by Ultimatelysocial