ছাত্র রাজনীতির হালচাল

দেশ ও দেশের মানুষকে মন থেকে ভালবেসে রাজনীতি করার মানসিকতা আজ অনেকের মধ্যেই খুজে পাওয়া কঠিন। সমগ্র দেশব্যাপী কতিপয় ছাত্রের মারামারি, হানাহানি ও অনৈতিক কাজের জন্য ছাত্রদের অভিভাবকসহ সকল শ্রেণি ও পেশার মানুষ চিন্তিত ও সংকিত। যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে তখন বিভিন্ন সংগঠনের নামে সে দলের দিকে ঝুঁকে পড়ে একশ্রেনীর স্বার্থানেষী মহল। দলের দোহাই দিয়ে অনৈতিক, চাঁদাবাজী, টেন্ডারবাজী দ্বারা পকেট ভারী করতে থাকে।

রাজনীতিতে ছাত্র রাজনীতির প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। কিন্তু কতিপয় ছাত্র নেতার অনৈতিক কার্যকলাপ ও অন্তঃদ্বন্দ ছাত্র রাজনীতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। তথ্য প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় ছাত্রলীগকে সতর্ক করে বলেন, ক্যাম্পাসে কেউ ছাত্রলীগের নামে সন¿াস করলে বিশৃংখলা করলে তাদের পুলিশের ধরিয়ে দিতে হবে। এটি একটি আশার আলোও বটে। সজীব ওয়াজেদ জয় দৃঢ়তার সাথে বলেন, যখন দল ক্ষমতায় থাকে, তখন সবাই ছাত্রলীগ আর আওয়ামী লীগের হয়ে যায়। নিজেদের দূর্নীতি ও লাভের জন্য আমাদের বিরুদ্ধে ষড়যন¿ চালাতে থাকে। সাধারন মানুষের বক্তব্য হলো দেশ স্বাধীন হওয়া পর্যন্ত তাদের ভুমিকা ভালছিল কিন্তু স্বাধীনতা উত্তর ছাত্রলীগ বা ছাত্রদলের ভূমিকা প্রশ্নাতীত নয়। শিবির আরও ক্ষতিকারক দল। বিশ্বের অনেক দেশেই ছাত্র রাজনীতি নেই, সেদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের লেখাপড়া, গবেষণার কাজ এগিয়ে যাচ্ছে। আমাদের দেশেও কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র রাজনীতি নেই, তাই সেখানে সমস্যাও নেই। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র রাজনীতি না থাকার কারনে সেখানে শিক্ষাকার্যক্রম যথারীতি চলছে। একাডেমিক নিয়ম-কানুন যথাযথ ভাবে চলছে। ছাত্র রাজনীতির নামে অন্তঃকলহ কারও জন্যই মঙ্গলজনক নয়। তিনি আরও বলেন, আমরা যদি সৎ থাকি, তবে চিন্তার কোন কারণ নেই। কেউ সঠিক শিক্ষা নিলে তার দূর্নীতি বা চাঁদাবাজী করার দরকার হয় না। আগামী ১ ডিসেম্বর হতে ৭ ডিসেম্বর সারা দেশে ক্লিন এন্ড সেইফ ক্যাম্পাস কর্মসূচী পরিচালনার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ বক্তব্য দেওয়ার জন্য জয়কে ধন্যবাদ।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের রাজনীতির কোন ধারনা নেই, কারণ বিজ্ঞানের ছাত্র হওয়ায় রাজনীতির ইতিহাস, রাজনীতিবিদদের জীবনীও তারা পড়ে না। তাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নেতাদের কাছ থেকে রাজনীতির ট্রেনিং নিয়ে রাজনীতি করা প্রয়োজন। কারন ছাত্র রাজনীতি ছাত্রদের নিয়ে। কিন্তু নিজের পকেট ভারী করার জন্য দল চালানোর কথা বলে ছাত্রদের নিকট হতে জোরপূর্বক চাঁদা আদায় সন¿াসী কর্মকান্ড বলেই বিবেচিত। তারা ছাত্র রাজনীতির দোহাই দিয়ে যখন রাষ্ট্রীয় রাজনীতিতে প্রবেশ করবে, তখনও দূর্নীতির মাধ্যমে দেশ ও জনগনকে হয়রানী ছাড়া আর কি করতে পারবে। বর্তমানে বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংগঠনের অভ্যন্তরীন কোন্দল ব্যক্তি স্বার্থকে নিয়ে, ক্ষমতার ভাগাভাগি নিয়ে। ক্ষমতায় গিয়ে বড় রাজনীতিবিদ হবেন এ চিন্তার মানুষ খুবই কম। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে গড়া ছাত্রলীগের ভূমিকা ইতিহাস হয়ে আছে। বঙ্গবন্ধুর জীবনী না পড়ে রাজনীতি যারা করেন তারা সত্যিকারের দেশ প্রেমিক রাজনীতিবিদ হতে পারবেন না। সত্যের উপর টিকে থাকতে পারবেন না। বঙ্গবন্ধু মানুষকে সাহায্য করতেন। ছাত্রজীবনেই তার সমন্ধে অনেক কিছু জানার সৌভাগ্য হয়েছিল। আমার বড় ভাই ফরিদপুর ৪ আসনের এমপি ছিলেন। তিনি বঙ্গবন্ধুর অনেক ঘটনাই বলতেন। গরীব মানুষকে গোলার ধান বিলি করে দিতেন, নতুন কোন জামা পরে স্কুলে যেয়ে গরীব ছাত্রদের গায়ে পরিয়ে দিয়ে বলতেন এটি তোমাকে মানাচ্ছে ভাল, তুমি এটি ব্যবহার কর। ১৯৭২ সালে গণভবনে দেখা করতে গেলে প্রথমেই আমার নাম জিজ্ঞাসা করে বলেন নকল করো না। দেশ গড়তে হবে। এমনি শত শত ঘটনা আছে যা থেকে একজন নবীন রাজনীতিবিদদের শিক্ষার অনেক কিছুই আছে। বঙ্গবন্ধু ছাত্র রাজনীতি করতেন, শিক্ষকের সাথে ছাত্র শিক্ষকের মর্যাদাও ঠিক রাখতেন। ব্যক্তিস্বার্থে বা রাষ্ট্রীয় স্বার্থে কখনও ধ্বংশাত্বক কাজে কাহাকেও উদ্বুর্দ্ধ করতেন না। বর্তমানের রাজনীতির ভাষা, প্রতিবাদের ভাষা, অগ্নিসংযোগ, মানুষ হত্যা। এ অবস্থান থেকে বের হতে হবে। বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা তেমনই।

ছাত্র রাজনীতিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে ছাত্র হয়েও ছাত্রদের কাছ থেকে হলে সিটের ব্যবস্থার কথা বলে চাঁদা তুলে পকেট ভারী করা অন্যায়। চাঁদা না দিলেই বিপদ, হলের সিট বাতিল ও শারীরিক লাঞ্চনা, বিল্ডিং তৈরিতে চাঁদা, কেন্দ্রীয় মসজিদের বারান্দা সম্প্রারন কাজে চাঁদা, যোগ্যাতাবলে শিক্ষক নিয়োগের পরও চাঁদা না দিলে রাজাকার নাম বসিয়ে অসম্মান করতে এখন দ্বিধাবোধ করছে না কেউ কেউ হাবিপ্রবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সিনিয়র প্রফেসরকে (যিনি বীর মুক্তিযোদ্ধা) অন্যায়ের প্রতিবাদ করায় তাকে গুলি করে হত্যার হুমকি দেয়া হয়েছে। তারা কারা ? এরা কি সত্যিকারের ছাত্রলীগ না অন্য কেউ? তাছাড়াও ছাত্র শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরাও এদের দ্বারা লাঞ্চিত হয়েছেন। শিক্ষকের কাছ থেকে ছিনতাই করা হচ্ছে নগদ টাকা। এর নাম আর যাই হোক ছাত্র রাজনীতি না, হতে পারে না। ইদানিং কোন কোন ক্যাম্পাসে দেখা যাচ্ছে ভাড়াটে লোকের আনাগোনা যেটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য আরও মারাত্বক। ঐ ছাত্র নেতারা ৫ বছরের শিক্ষাজীবনকে ১২ বছরে রুপ দিয়ে কোটি টাকার সম্পদশালী হয়েছে এমন নজির ভুরি ভুরি। ছাত্র বয়সে এরা টাকা খরচ করে শিক্ষকদের বিরুদ্ধাচারন করছে। সাধারন ছাত্র/ছাত্রীদের মিছিল মিটিং এ ধরে রাখতে প্যাকেট লাঞ্চ করানো হচ্ছে। এ কারণে অনেকে হল ত্যাগ করেছে। পরীক্ষার্থীদের ফাইনাল সেমিস্টার পরীক্ষাকে ভয় ভীতি দেখিয়ে বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে। শিক্ষকরা তাদের ক্লাশে ফিরিয়ে আনতে ছাত্রদের অনুরোধ জানিয়েও ব্যর্থ হচ্ছেন। নিষ্পাপ ছাত্রদের জীবনের মুল্য অনেক। একটি দিনের কারনেও অনেকের জীবন থেকে ঝড়ে পড়তে পারে লোভনীয় চাকুরীর সুযোগ। এর জন্য দায়ী ঐ সকল ছাত্র নেতা যারা ডিজিটাল সন¿াস চালিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রমকে অচল করে দিতে চায়। তাদের প্রতিবাদে সকলকে ও সবখানে সোচ্চার হতে হবে।

শিক্ষক-ছাত্রের সম্পর্ক মধূর। সন্তান সমতুল্য। তারা লেখা পড়া করে ভালভাবে প্রতিষ্ঠিত হোক এটাই সকল শিক্ষকের একান্ত চাওয়া পাওয়া। ছ্ত্রারা শিক্ষকদের ঋন কোন দিন শোধ করতে পারবে না। শিক্ষকরাও চায় না কোন ছ্ত্রা জীবনে ক্ষতিগ্রস্থ হোক। যখন শুনি এক ছাত্র ভাল পজিশনে আছে। গর্ব হয়। এটাই একজন শিক্ষকের মনের অনুভুতি। শিক্ষক কোন দিনই ছাত্রদের প্রতিপক্ষ নয়, বরং সন্তানতুল্য। এটি শুধু শিক্ষকরাই ভাবলে হবে না, ছাত্রদেরকেও ভাবতে হবে। এজন্য সুস্থ ছাত্র রাজনীতি চাই। এমন রাজনীতি নয়, যার নামে দেশে সন¿াসী তৈরি করে প্রতিষ্ঠানের দরজা জানালা ভাঙ্গা হবে, গাড়ী ভাঙ্গা হবে বা গাড়ীর চাকা পাংচার করে যাতায়াতের পথকে রুদ্ধ করা হবে। আজ সরকারও এসব ব্যাপারে জিরো টলারেন্স নীতির উপর অবিচল। প্রধানমন¿ীর তথ্য প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের বক্তব্য থেকে বিষয়টি স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হচ্ছে, আইন সবার জন্য সমান। অন্যায়কারীকে শাস্তি পেতেই হবে।।

দৈনিক ইত্তেফাক (উপ-সম্পাদকীয়,পৃঃ ৮) ২৪/১১/২০১৪Students politics halcal

https://archive1.ittefaq.com.bd/print-edition/sub-editorial/2014/11/24/16444.html

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Wordpress Social Share Plugin powered by Ultimatelysocial