বিচারকাজে শৈথিল্য অপরাধ বাড়ায়

আগে এত কোর্ট কাচারী ও আইন বিশেষজ্ঞ ছিলেন না। তখন অপরাধের বিচার হতো গ্রাম্য সালিসে। সেখানে বিচারকার্য দ্রুত সম্পন্ন হতো। সমাজের গন্যমান্য ব্যক্তি বা মোড়লরাই উভয় পক্ষকে একত্র করে শালিশ বসাতেন। উভয় পক্ষের স্বাক্ষ্য গ্রহণ করে কয়েক ঘন্টার মধ্যেই বিচারকার্য শেষ করতেন। রায়ের মধ্যে ছিল বেত্রাঘাত, কান ধরে উঠবস, সমাজ থেকে বয়কট করা, অর্থদন্ড ইত্যাদি। দিন দিন শিক্ষিতের হার বাড়ছে এবং বিচার বিভাগের ভিত মজবুত হচ্ছে। বিচার কাজ পরিচালনার জন্য শক্তিশালী আইনের কাঠামো তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে মানুষ বাড়ছে। অন্যায়-অবিচার বাড়ছে এবং বিচার প্রার্থীর সংখ্যাও বাড়ছে। ফলে আদালতে মামলা জটও বাড়ছে এবং বিচারপ্রক্রিয়া ক্রমেই বিলম্বিত হচ্ছে। এতে কিন্তু অপরাধ কার্যক্রমও উৎসাহিত হয়। অন্যদিকে অপরাধীরা বিভিন্নভাবে রাজনৈতিক কারণে পার পেয়ে যাওয়ারও আশঙ্কা থেকে যাচ্ছে। অনেক অপরাধীর স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ, দেশত্যাগ, বিদেশে আত্মগোপন ও রাজনৈতিক দলের সদস্য বনে গিয়ে অপরাধ বিষয়টি আড়াল হয়ে যাচ্ছে-এমন অনেক ঘটনাও ঘটেছে। অনেক সময় অপরাধী সনাক্ত করতে সন্দেহজনকভাবে কিছু ভালো লোক ধরা পড়ে হাজত খেটে জীবনের মূল্যবান সময় শেষ হয়েছে। এমন অনেক ঘটনার জন্ম হয়েছে এদেশে। কিছু ক্ষেত্রে রাজনৈতিক কারণেও ইচ্ছাকৃতভাবে বিষয়টি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করা হয়

উল্লেখ্য, ২০০৪ সালের ১ ফেব্রুয়ারী রাতে পুলিশের দুই সার্জেন্ট আলাউদ্দীন এবং হেলালউদ্দীন ভূইয়া চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীতীরের ফার্টিলাইজার লিমিটেডের জেটিতে ১০ ট্রাক অস্ত্রের চালান আটক করেন। বিধি মোতাবেক ওই পুলিশ সার্জেন্টদের মহৎ কাজের জন্য প্রাপ্য ছিল পুরস্কার ও পদোন্নতি। তা না হয়ে তাদের ভাগ্যে জুটল শারিরিক অত্যাচার, জেল-জুলুম ও সামাজিকভাবে সম্মানহানি। একে-৪৭ রাইফেল হাতে তুলে দিয়ে ছবি পত্রিকায় প্রকাশ করে তাদের মান সম্মান ভুলুন্ঠিত করা হয়। অথচ ওই ১০ ট্রাক অস্ত্রের মধ্যে একে-৪৭ রাইফেল ছিলই না, যা তদন্তে প্রমাণিত হয়। ফলে ২০১১ সালে উভয়েই নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে পুনরায় চাকুরীতে যোগদান করার সুযোগ পান। এটিই যথেষ্ট নয়। কিন্তু জীবনের প্রায় ২৭টি মাস চলে যায় তাঁদের যা অফেরতযোগ্য। ১০ ট্রাক অস্ত্র আটকের কারণে তাঁরা রাষ্ট্রীয় সন্মাননা পাওয়ার দাবীদার। এ ধরনের ঘটনায় মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে নিরুৎসাহিত হবে। ফলে আইন শৃঙ্খলার অবনতি ঘটবে।

এমনিভাবে স্বাধীনতার ৪২ বছরে বেশ কয়েকটি হত্যাকান্ডের বিচার যথা সময়ে না হওয়ায় এরই মধ্যে হাজারো অপরাধী জন্ম নিয়েছে এ দেশে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, বুদ্ধিজীবী হত্যাকারীদের বিচার, জেলহত্যাকারীদের বিচার, ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগষ্ট বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যাকারীদের বিচার, ২১ আগষ্টের গ্রেনেড হামলাকারীদের বিচার, ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলা সহ বিভিন্ন অন্যায়ের বিচারকাজ বিলম্বিত হওয়ায় সন্ত্রাসীদের দৌরাত্ম্য বেড়েই যাচ্ছে। বিলম্বিত হলে যে সমস্যা হতে পারে তা হলো- ১. অন্যায়কারীর দৌরাত্ম বেড়ে যাওয়া, ২. পাবলিক সেন্টিমেন্ট স্তিমিত হওয়া, ৩. আসামীর দেশত্যাগ, ৪. সাক্ষী পেতে সমস্যার সৃষ্টি, ৫. আসামী ও সাক্ষীর বার্ধক্যজনিত মৃত্যু, ৬. বৃদ্ধ বয়সে ফাঁসী কার্যকরের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের ফাঁসীর রায়কে অমানবিক মনে করা ইত্যাদি। এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে বঙ্গবন্ধু হত্যা ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বিষয়ে। যুবক বয়সে অপরাধ করেছেন, রায় হয়েছে বৃদ্ধ বয়সে। নতুন প্রজন্মের কাছে বৃদ্ধ ব্যক্তিটিকে ফাঁসী দেওয়া বা জেল-জরিমানার বিষয়টি কষ্টকর মনে হয়। অথচ তাদের অপরাধের মাত্রা এতটাই বেশি ছিল যা নতুন প্রজন্মের ধারণার বাইরে। সুতরাং অপরাধ যে দলের বা দেশেরই হোক বিচার হতে হবে দ্রুততম সময়ে। সাক্ষীদের নিরাপত্তা বিধান যথেষ্ট গুরুত্ব বহন করে।

উল্লেখ্য, যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসীর রায়ে কয়েকজন সাক্ষীকে হত্যা ও গুম করার ঘটনাসহ ঘরবাড়ী, দোকান-পাটে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। বিশেষ আদালতে স্বল্প সময়ে বিচারকাজ সম্পন্ন, রায় বাস্তবায়নই অপরাধ দমনের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে পারে। এ ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। গত ৫ জানুয়ারীর জাতীয় নির্বাচনে জীবনবাজি রেখেই ৪০ শতাংশ ভোটার ভোট দিয়েছে। বাধা না দিলে প্রায় ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ ভোটার ভোট কেন্দ্রে উপস্থিত হতো, তাতে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই বলে মন্তব্য করেছেন অনেকেই। বিগত ১৩ মাসের রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার এদেশের শিক্ষার্থী ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কৃষক ও কৃষিপণ্য, শিল্পকারখানা ও শ্রমিক, মসজিদ-মাদ্রাসা এমনকি মসজিদের কার্পেট ও বায়তুল মোকাররম এলাকায় কোরান শরীফ সহ ধর্মীয় মালামালে অগ্নিসংযোগ বিগত ৪৩ বছরে বিচারকাজ বিলম্বিত হওয়ারই ফসল। দেশ বাঁচাতে হবে, দেশের সম্পদ বাঁচাতে হবে, দেশের কৃষক ও কৃষিপণ্য বাঁচাতে হবে, শিক্ষা ও শিক্ষার্থীদের বাঁচাতে হবে। এ কাজটি সরকারকেই করতে হবে।

দৈনিক কালের কন্ঠ (উপ-সম্পাদকীয়, পৃঃ ১৪) ০৩/০৩/২০১৪

https://www.kalerkantho.com/print-edition/sub-editorial/2014/03/03/57822

 

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Wordpress Social Share Plugin powered by Ultimatelysocial