মহান পেশা শিক্ষকতাঃকরণীয় ও বর্জনীয়

ধর্ম, বর্ণ, ধনী দরিদ্রের ঘরে যে সন্তানের আগমন ঘটে এ সবুজ বিশ্বে সে নিষ্পাপ। পিতামাতার পরিবেশ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেই বেড়ে উঠতে থাকে, যে ভাষায়ই হোক সেটিই তার মার্তৃভাষা। মানুষের ভালবাসা অর্জন করা যায় যে দক্ষতাগুলো থাকলে, নিজেদের মধ্যে সেগুলো সৃষ্টি করাই প্রকৃত সাফল্য। ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি এপিজে আব্দুল কালাম এর একটি বাণী হলো “স্বপ্ন সেটা নয়, যেটা মানুষ ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে দেখে, স্বপ্ন সেটাই, যেটা পূরণের আশা মানুষকে ঘুমাতে দেয় না”। সকল মানুষের জীবনে এক বা একাধিক স্বপ্ন থাকে-মানুষের মত মানুষ হয়ে সমাজে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করা। প্রত্যেকটি শিক্ষিত মানুষের শিক্ষা গ্রহণের পিছনে একাধিক শিক্ষাগুরু বা শিক্ষক থাকেন। প্রকৃতপক্ষে শিক্ষা পেশাকে বলা হয় পবিত্র পেশা। তবে যারা এ পবিত্র পেশায় চাকুরী করে সংসার চালায় তারা কতটা স্বচ্ছতার ছাপ জীবনে ফেলতে পারছেন সেটাই মূল বিষয়।

চাওয়া পাওয়ার শেষ বলতে কিছু নেই। মূলকথা হল স্কুল কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মনের অনুভূতি ও আনন্দ ভিন্নতর হতে পারে। তবে, শিক্ষকতা পেশাই শ্রেষ্ঠ যেহেতু শিক্ষকদের বলা হয় মানুষ গড়ার কারিগর এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে বলা যেতে পারে শিক্ষা বিস্তারের কারখানা। যে যেভাবেই প্রকাশ করি না কেন এটিই বাস্তব সত্য। প্রতিটি মানুষই সম্মান প্রতিপত্তি নিয়ে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হতে চায় কিন্তু বাস্তবে কজনের ভাগ্যে তা জোটে। চেহারা নয়, ভদ্রতার গুণে মানুষ আপন জনের মধ্যে প্রিয় হয়ে ওঠে (টমাস হার্ড)।
বিচারের মানদ-ে প্রত্যেকটি পেশাই যার যার অবস্থান থেকে গুরুত্বের দাবী রাখে। কোন পেশাকেই ছোট করে দেখার অবকাশ নেই, যদি সে পেশা মানব কল্যাণে কাজ করে অথবা মানব কল্যাণে অবদান রাখতে পারে। সকল সেক্টরের উন্নয়নে শিক্ষিত লোকের ভূমিকাকে সম্মানের সাথে বিবেচনায় আনা হয়। সকল শিক্ষিত লোকের শিক্ষাগুরুই তার শিক্ষক। প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত থাকেন যারা তারা সকলেই শিক্ষাগুরু। এ কারণেই শিক্ষকতা পেশাকে মহান এবং সম্মানের পেশা হিসেবে ভাবা হয়। উচ্চ পর্যায়ের চাকুরীজীবিদের ক্ষেত্রেও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক যিনি, তিনিও সম্মান পেয়ে থাকেন তার ঐ বয়স্ক উচ্চ পর্যায়ের চাকুরীজীবি ছাত্রের কাছ থেকে।

ব্রিটিশ আমল বেশী দিন আগের কথা নয়। সে সময়েও শিক্ষকতা পেশাকে সবোর্চ্চ সম্মানিত পেশা হিসেবে মূল্যায়ন করা হত। ব্রিটিশ শাসনামলের শেষের দিকে বা পাকিস্তান আমলে একজন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকের মাসিক বেতন ছিল মাত্র ৫ টাকা। অর্থ বড় বিষয় নয়। সম্মানের দিকে তাকিয়েই পেশায় আসতেন। শিক্ষকদের প্রতি অভিভাবকদেরও সম্মানের কমতি ছিল না। অনেক শিক্ষক টিউশনী করাতেন না, তবে কোন বিষয়ে ছাত্রদের ঘাটতি থাকলে রাস্তা ঘাটেও দাড়িয়ে কিছু ছোবক দিতেন। আদব কায়দা শেখাতেন। অভিভাবকরা বলতেন তার সন্তানকে প্রয়োজনে বেত্রাঘাত করে শেখানোর উপদেশ দিতেন, বলতেন হাড় আমার মাংস আপনার। বর্তমান যুগে, এ প্রথার বিলুপ্তি ঘটেছে। শিক্ষককে বলা হয় পিতামাতার পরের অবস্থানের মানুষ। ছাত্র/ছাত্রীদের বড় পেশায় চাকুরী পাওয়াটা অনেক বড় গর্বের।

প্রত্যেক শিক্ষিত মানুষকেই শিক্ষার আলো পেতে শিক্ষক প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত পেীঁছতে বেশ কয়েক ডজন শিক্ষকের কাছ থেকে শিক্ষা নিতে হয় বিভিন্ন বিষয়ে। রাষ্ট্র বা প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ ব্যক্তি থেকে আরম্ভ করে সর্বনি¤œ অল্প শিক্ষিত মানুষটিও কোন না কোন শিক্ষকের হাতে শিক্ষা গ্রহণ করেছেন বা শিক্ষার হাতেখড়ি নিয়েছেন। শিক্ষকতা পেশা বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতার ক্ষেত্রে সবচেয়ে মেধাবী, গবেষণায় পারদর্শী, উচ্চ শিক্ষিত মানুষগুলোই স্থান পেয়ে থাকেন। সর্ব যুগে, সর্ব কালে এ পেশা সব দিক থেকে সম্মানের, এতে বিন্দুমাত্র সন্দেহের অবকাশ নেই। তবে বিভিন্ন কারণে স্থান কাল পাত্রভেদে, চারিত্রিক বিপর্যয়ের কারণে সম্মানের স্থানটি প্রতিস্থাপিত হয় অসম্মানের অঙ্গার দিয়ে। এটি নতুন এক অধ্যায়ে, নতুন এক বিপর্যয়। যে বিষয়টি একজন শিক্ষকই শুধু নয়, একটি পরিবার, একটি প্রতিষ্ঠানকে বিতর্কিত করে। ইভটিজিং এর নামটি শুনেছি আজ থেকে প্রায় ১৬-১৭ বছর পূর্বে, যেটি সাধারণত বখাটে ছাত্র অথবা বখাটে পথচারীদের দ্বারাই হয়ে থাকে। এখন এটি তেমন শুনা যায় না। তার অর্থ এ নয় যে এটি সমাজে নেই। এটি এখন বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে। তবে শিক্ষিত মানুষ বিশেষ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যখন যৌন হয়রানির কথা কোন শিক্ষকের বিরুদ্ধে হয়, তখন মান সম্মান, বিবেক বুদ্ধি সব ক্ষেত্রেই পচন ধরে।

শুধু শিক্ষকই নয় যে কোন মানুষের জন্যই যৌন হয়রানী একটি গর্হিত কাজ। নিজের দিক থেকে চিন্তা করতে হবে। নিজের আপনজন স্ত্রী, মেয়ে বা অন্য কাহাকেও যদি এ ধরণের অপমানজনক কাজের শিকার হতে হত তখন ঐ ব্যক্তি বা পরিবারের পক্ষ থেকে কি ধরণের অসম্মানের কালিমা পরিবারে নেমে আসত তা কি ভেবে দেখা হয়? সকল ক্ষেত্রে নিজের বিচার করতে হবে নিজেকে দিয়ে। মহান পেশা শিক্ষকতা, এটি শত ভাগ সত্য হলেও তা কতটা ধরে রাখা সম্ভব হয়েছে। ধানের মধ্যে চিটা থাকে, সরিষার মধ্যেও রয়েছে ভূত। তেমনি শিক্ষকদের মধ্যে অতি নগণ্য সংখ্যক যা  calculation করা কঠিন, তাদের অসৌজন্যতার কারণে সমাজে পড়ছে কালিমার দাগ। অনেক সময় শত্রুতাবশতঃ বিভিন্ন কলা কৌশলেও চলে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার কৌশল হিসেবে ব্যবহার করা হয় যৌন হয়রানী নামক অস্ত্রটি। সব অভিযোগ যে সত্য তা যেমন ঠিক নয়, তেমনি সব যে মিথ্যা তা ও নয়। তদন্তের উপর ভর করে সত্য মিথ্যা বেরিয়ে আসছে। যৌন হয়রানী ঘটে গোপনে ও লোক চক্ষুর আড়ালে। এ জন্য কাকে কি ভাবে দায়ী করবেন? এক হাতে যেমন তালি বাজে না তেমনি একক ব্যক্তির দ্বারা সম্ভবও নয়। অনেকাংশে উভয় পক্ষের মধ্যে থাকে আতাত। আবার উভয়ের মধ্যে থাকে স্বার্থ। যার যার অবস্থান থেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে হবে।

শিক্ষকদের করণীয় ও বর্জনীয় কি তা বলার পূর্বেই বলতে হয়, শ্রেষ্ঠ আদালত মানুষের বিবেক। বিবেকবান মানুষকে বলা হয় আদর্শ মানুষ, যার মধ্যে থাকবে মনুষ্যত্ববোধ, যিনি সমাজ ও দেশের মানুষকে দেখাবেন সঠিক পথ। যে পথের পদযাত্রায় প্রতিটি মানুষ সত্য ও নিষ্ঠাবান চরিত্রের অধিকারী হবেন। শিক্ষক যখন সকল ভাল গুণের অধিকারী হবেন, তখনই সমাজের মানুষ তাকে অনুসরণ ও অনুকরণ করবে।

একজন শিক্ষক যখন কোন অশালীন, অন্যায়, অশ্লীল অঙ্গার সদৃশ চরিত্রের অধিকারী হবেন, তখন সমাজ তাকে গ্রহণ করতে চাইবে না। যৌন হয়রানীর মত জঘণ্য কাজ বা কথা ইতিপূর্বে তেমনটা শুনা যেত না। এ বিষয়টি এ বিষয়টির মাধ্যমে উভয় পক্ষ ঘৃণার পাত্র হিসেবে সকলের কাছে পরিচিতি পায়। এ জঘণ্য কাজটি শিক্ষক ও ছাত্র সমাজকেই শুধু হেয় প্রতিপণ্য করে না, সমগ্র সমাজ ও দেশকে হেয় করে। ইসলাম ধর্মের বিধান মতে যার শাস্তি হল দুররা মেরে দুনিয়া থেকে বিদায় দেওয়া। সর্বশেষ মন্তব্য হল, শিক্ষকতাই শ্রেষ্ঠ পেশা যার মান শত ভাগ। কিন্তু প্রত্যেকটি মানুষের কর্মের ফলাফলই যার যার অবস্থানকে নির্ধারণ করে দেয়। ফলে কেহ হয় সম্মানিত, কেহ বা হয় অসম্মানিত ও ঘৃণিত।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Wordpress Social Share Plugin powered by Ultimatelysocial