১৫ ও ২১ ই আগষ্টের হিংস্রতা এবং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ

১৫ই আগষ্ট জাতীয় শোক দিবস। ১৯৭৫ সালের এই দিনে সেনাবাহিনীর কলঙ্কিত কয়েকজন সেনা সদস্য ধানমন্ডির ৩২ নং বাড়ীতে উপস্থিত এক অনুষ্ঠানে আত্মীয়-স্বজন ও পরিবারের সকল সদস্যসহ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার মধ্য দিয়ে ইতিহাসের এক কলঙ্কময় অধ্যায়ের সূচনা করেছিল। এ নৃশংস ঘটনায় সমগ্র জাতি গভীরভাবে শোকাহত। ঐ ঘটনায় ঘাতকরা বাসার কাজের লোক এবং গার্ডকে পর্যন্ত হত্যা করে। অবুঝ শিশু সন্তান শেখ রাসেল ও অন্তঃসত্ত্বা নব বধূরাও সেদিন নিস্কৃতি পায়নি ঐ নরঘাতক পিশাচদের হাত থেকে। এদের আত্মা হিংস্র পশুর চেয়েও মারাত্বক। বাঙালি জাতি যুগযুগ ধরে এদের ঘৃণা করবে ও ধিক্কার জানাবে। বঙ্গবন্ধুর মত আন্তর্জাতিক পর্যায়ের মহান নেতাকে হারিয়ে দেশ ও জনগণের যে ক্ষতি হয়েছে তা কোনদিনই পূরণ করা সম্ভব নয়। এ জঘন্য ঘটনার মধ্য দিয়ে তারা দেশ ও জাতিকে বিশ্ব দরবারে হেয় প্রতিপন্ন ও সন্ত্রাসী রাষ্ট্র হিসেবে পরিচয় করার চেষ্টা করেছিল। বাংলাদেশের উন্নয়নের গতিকে বাধাগ্রস্থ করার চেষ্টা করেছিল এমনকি এখনও করে যাচ্ছে। পাকিস্তানের তালেবান রাষ্ট্র বানিয়ে এদেশের মানুষের ঘুমকে হারাম করার চেষ্টা চালাচ্ছে, যার আরও অনেক প্রমাণ বিভিন্ন সময়ের সহিংস ঘটনাপ্রবাহ।

ঐ নৃশংস হত্যার খবর শুনে বৃটেনের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী হ্যারল্ড উইলসন লন্ডনের এক বাঙ্গালি সাংবাদিকের কাছে লিখিত শোকবাণীতে উল্লেখ করেন, এটা আপনাদের কাছে এক বিরাট ন্যাশনাল ট্রাজেডি। আমার কাছে এক পরম শোকাবহ পার্সোনাল ট্রাজেডি। বিদেশী সাংবাদিক সিরিল ডান বলেছেন, বাঙ্গালির হাজার বছরের ইতিহাসে শেখ মুজিবই একমাত্র নেতা যিনি রক্তে, বর্ণে, ভাষায়, কৃষ্টিতে এবং জন্মগত সূত্রেও ছিলেন খাঁটি বাঙ্গালী। বৃটিশ মানবতাবাদী আন্দোলনের প্রয়াত নেতা ও মনীষী লর্ড ব্রকওয়ে মন্তব্য করেছিলেন যে, নেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব “আমেরিকার জর্জ ওয়াশিংটন, ভারতের মহাত্মাগান্ধী, আয়ারল্যান্ডের জর্জ ডি ভ্যালেরার চেয়েও এক অর্থে মহান নেতা যিনি একই সাথে একটি “স্বাধীন জাতি ও স্বাধীন ভূমির জনক”।

বঙ্গবন্ধু তার অকৃত্রিম ভালবাসা ও মেধার বহিঃপ্রকাশ দ্বারা বাঙ্গালি জাতির হৃদয়কে জয় করেছিলেন। সে কারনেই বঙ্গবন্ধুর আহবানে ৩০ লক্ষ মুক্তিকামী মানুষ জীবন উৎসর্গ করতে দ্বিধাবোধ করেননি। ২৩ বছরের পাক শাসনামলের প্রায় ১৪ টি বছরই রাজনৈতিক কারণে কারাবরণ করতে হয়েছে তাঁকে।

স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মাত্র অল্প সময়ের জন্য দেশ ও জাতি গঠনের সুযোগ পেলেও অনেক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের স্বাক্ষর রেখেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তার কয়েকটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার তথ্য তুলে ধরা হলো, যেগুলো বর্তমান সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সফলভাবে বাস্তবায়ন করে যাচ্ছেন। যেমনঃ ১৬ এপ্রিল ১৯৭৪ সালে মিয়ানমার ও ভারতের কাছে দখলকৃত সমুদ্র জল সীমানা পুনঃনির্ধারনের জন্য আন্তর্জাতিক আদালতে বঙ্গবন্ধু সরকার কর্তৃক আবেদন করা হয়েছিল, যা ১৪ মার্চ ২০১২ সালে এবং ৮ জুলাই ২০১৪ সালে যথাক্রমে মিয়ানমার ও ভারত থেকে ফেরত আনা হয়। এর পরিমান প্রায় ১ লক্ষ ৩০ হাজার বর্গকিলোমিটার। তেমনি ১৯৭৪ সালে ছিটমহল বিনিময় (মুজিব-ইন্দিরা) চুক্তি যেটি বাস্তবায়িত হয় ৭ জুন ২০১৫ সালে শেখ হাসিনা-নরেন্দ্র মোদীর চুক্তির মাধ্যমে। এর ফলে ছিটমহলবাসীর ৬৮ বছরের বন্দি জীবনের অবসান ঘটিয়ে চুড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয় ৩১ জুলাই ২০১৫-তে। উল্লেখ্য ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান “দেশ গড়েছেন” এবং বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা “দেশ রক্ষা” করছেন। এছাড়াও কৃষি, যোগাযোগ ও শিক্ষাসহ বিভিন্ন সেক্টরের উন্নয়নের গতি ফিরে আসার মুহুর্তে আত্মীয়-স্বজনসহ পরিবারের সদস্যদের অকালে জীবন দিতে হল বঙ্গবন্ধুকে। আজও সেই ধানমন্ডির ৩২ নং বাড়ীটি হত্যাকান্ডের চিত্র ধারণ করে দাঁড়িয়ে আছে স্বাক্ষী হয়ে। রক্তের দাগ আর জীবন হননকারী বুলেটের সচিত্র প্রমাণ বহন করছে দেওয়ালগুলো, যা দর্শনার্থীদের মনকে ব্যাথিত করে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শুধু জনদরদী নেতাই নন, প্রকৃত অর্থেই ছিলেন একজন ধর্মপ্রাণ আদর্শ মুসলমান।

ইসলাম ধর্মের প্রচার ও প্রসারের জন্য কওমী মাদ্রাসা শিক্ষাকে বেশী গুরুত্ব দিতেন। তাছাড়া তাবলীগ জামায়াতকেও মনেপ্রাণে পছন্দ করতেন। ইসলামের প্রচার ও প্রসারের জন্য ১৯৭৫ সালের ২২ শে মার্চ এক অধ্যাদেশ বলে ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেন। এমন একজন ধর্মপ্রাণ মহান নেতার হত্যাকারীদের বাঁচানোর জন্য ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ (কালো আইন) জারী করে হত্যাকারীদের বিচার কার্যক্রম বন্ধের অপচেষ্টা চালানো ছিল আর একটি অসাংবিধানিক ষড়যন্ত্র। ফলে হত্যাকারীরা আরও বেপরোয়া হয়ে কতিপয় রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপরও ধারাবাহিকভাবে হামলা চালানোর সাহস পায়। যেমন- ১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি শেখ হাসিনার নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত মিছিলে গুলিবর্ষণ (নিহত ৯ জন), ১৯৯১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর সংসদ উপনির্বাচনের সময় তাকে উদ্দেশ্য করে গুলি চালায়, ১৯৯৩ সালের ২৪ জানুয়ারি চট্টগ্রামে শেখ হাসিনার জনসভায় গুলি ও বোমা হামলায় (৫০ জন আহত), ১৯৯৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর শেখ হাসিনার ট্র্রেন অভিযাত্রায় ঈশ্বরদী ও নাটোরে গুলিবর্ষণ (ম্যাজিষ্ট্রেট ও পুলিশসহ আহত শতাধিক), ২০০২ সালের ৩০ আগষ্ট সকাল ১১ টায় কলারোয়া উপজেলায় শেখ হাসিনার গাড়িবহরে হামলা, এবং সর্বপরি ২১ শে আগষ্ট ২০০৪ তারিখে জননেত্রী শেখ হাসিনার জনসভায় গ্রেনেড হামলা চালিয়ে আইভি রহমানসহ প্রায় ২৪ জন আওয়ামীলীগ নেতা কর্মীকে হত্যা ও প্রায় ৩০০ জনকে আহত করা হয়, যারা আজও পঙ্গুত্ত্ব জীবন যাপন করছেন। এদের অনেকের শরীরে রয়েছে গ্রেনেডের স্প্রিন্টার। ১৫ ও ২১ শে আগষ্টসহ বিভিন্ন মামলায় জড়িত অপরাধীদের যথাসময়ে বিচারকার্য সম্পন্ন না করায় দেশের আইন শৃঙ্খলার ব্যঘাত ঘটছে। নতুন প্রজন্মের মনে অনেক প্রশ্ন এমন একজন নিবেদিত প্রাণ বঙ্গবন্ধুকে কেন হত্যা  করল ঘাতকরা? এতে কতিপয় ঘাতকের ফাঁসিই যথেষ্ট নয়। তাদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন বিশিষ্ট জনেরা।

বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত বাঙালিরা এ দিবসটিকে গভীর শ্রদ্ধার সাথে ব্যথিত মন নিয়ে যথাযথ মর্যাদায় পালন করেন। বাঙালি জাতির গভীর ভালবাসার মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুরকে হারিয়ে দেশ গভীর ষড়যন্ত্রের বেড়াজ্বালে আবদ্ধ। গণতন্ত্রকে হত্যা করে নৈরাজ্য, দূর্নীতি, মারামারি, হানাহানির রাজত্ব কায়েম করা হয়। তারপর চলতে থাকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের লড়াই। এরমধ্য দিয়ে দেশের অর্থনীতি ভেঙ্গে পড়ে এবং বাংলাদেশ বিশ্বের কাছে অকার্যকর রাষ্ট্র হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। আরম্ভ হয় ঘুষ, দূর্নীতি, অর্থ পাচার, মারামারি, হানাহানিসহ অনৈতিক কার্যকলাপ। এ অপতৎপরতার মাধ্যমে স্বাধীনতা ও স্বাধীন বাংলাদেশকে অকার্যকর করার পায়তারা করেছিল। এখনও বিভিন্ন ভঙ্গিমায় সেই অশুভ পথেই হাঁটছে তারা। কিন্তু তারা কি কখনও ভেবেছিল বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যার মধ্যেও রয়েছে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন মাখা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রবল আকাঙ্খা। শত্র“পক্ষ কি কখনও ভেবেছে তাদের বিচারের সন্মুখীন হতে হবে? তারা কি কখনও ভেবেছে তাদের ফাঁসির কাষ্টে ঝুলতে হবে? হত্যাকারীরা কি কোন দিন ভেবেছেন স্বাধীনতার পক্ষের মানুষ শক্তিশালী হয়ে ঘুরে দাঁড়াবে?

যুগ যুগ ধরে আওয়ামী লীগ তথা স্বাধীনতার পক্ষের দল বিভিন্ন ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে প্রতিহত করার শক্তি ও ক্ষমতা থাকা সত্বেও। শুধু আত্মরক্ষা করেই চলছে, ধৈর্য্যধারন করছে। এ ধৈর্য্যধারন শুধু দেশের স্বার্থে, জনগণের স্বার্থে, অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বার্থে, বাঙালি জাতির ভাবমূর্তি রক্ষা ও বৃদ্ধির স্বার্থে, মধ্যম আয়ের দেশ গড়ার স্বার্থে সর্বোপরি ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মানের স্বার্থে। এগুলো আওয়ামী লীগ সরকারের মহানুভবতা ও সুস্থ রাজনীতির বাহিঃপ্রকাশ। আমরা সকলেই শান্তির প্রত্যাশী। হিংস্রতার সেই অশুভ শক্তি চিরতরে দেশ ও সমাজ থেকে নির্মূল হোক এ প্রত্যাশা সকলের।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Wordpress Social Share Plugin powered by Ultimatelysocial